Friday, 3 January 2025

ভ্রমি বীরভূমে

আমি থাকি অজয়ের দক্ষিণে। পশ্চিম বর্দ্ধমান জেলা য়। অজয়ই প্রাকৃতিক  সীমারেখা। উত্তরে বীরভূম। দক্ষিণে বর্ধমান। সেই কবেকার এই সীমারেখা। অজয়ের উত্তরে উত্তর রাঢ়। বজ্রভূমি, বীরভূমি - বীরভূম। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ১৮০৬ সালে অজয় কে  প্রাকৃতিক সীমারেখা হিসাবে গ্রহণ করে। 

ওপারে ইলামবাজার। বীরভূমের প্রবেশ দ্বার। 

আমাদের নিকটতম গঞ্জ। এপার ওপারের  নিত্য যাতায়াত। সীমান্তের এই অংশের মানুষ দের বরাবরের টান ওপারের প্রতি। পানাগড়, দুর্গাপুর

যাওয়া অপেক্ষা বোলপুর যাওয়ার প্রতি একটা প্রবণতা কাজ করে। এই এলাকার অনেক সম্পন্ন

মানুষ ওপারে চলে গেছেন। ইলামবাজার বা বোলপুরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। 

আমারও ইচ্ছা ছিল।কিন্তু নানা কারণে হয়নি।  ইলামবাজার হাইস্কুলে পড়েছি। 

কিছুদিন পড়িয়েছি। বোলপুর কলেজে পড়েছি। 

সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডে বীরভূমে

অনেক গুলি বছর কাটিয়েছি। বীরভূমের প্রতি 

আলাদা এক ভালোবাসা কাজ করে। সেই ভালোবাসা থেকে ই আমার সামান্য বীরভূম চর্চা। 

আমার লেখালেখির বড় অংশ জুড়েই বীরভূম। 

তাই প্রথম বই টি করতে পেরেছি ইলামবাজার কে কেন্দ্র করেই।  কুঠিবাড়ি ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য। 

এবং ইলামবাজারের কথা ও কাহিনী। 

অন্যান্য যে সব লেখা এই সমাজমাধ্যমে, ফেসবুক পেজে বা ব্লগে রয়েছে বা নানা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেই সব লেখা একত্রিত করার ইচ্ছা  আছে। ইচ্ছা ই - বুক করার ও। আমি চাই আমার সব লেখা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে। 

কিনে বই খুব কম জনেই পড়ে। আমার ধারণা আগামী তে মানুষ এখানেই পড়ে নিতে চাইবে। 

 কিন্তু বইমেলায় বেশ ভিড় হয়। বই এর একটা আলাদা মূল্য আছে অস্বীকার করিনা। বই, বই ই। 

তবু অনেক কথা আছে। আমার যা অভিজ্ঞতা সে না হয় আরেক দিন বলা যাবে। 

আজ বীরভূম বিষয়ক লেখালেখির একটা  তালিকা। 

  • বীরভূমের লোহা মহল 

  • মুলুটির মন্দির রাজি, 

  • গণপুরের মন্দির, ' ফুলপাথরের মহাকাব্য'

  • মল্লারপুর 

  • রাজনগর কথা 

  • রসা - বড়রা র প্রস্তর দেউল 

  • বীরভূমের বৈচিত্র্যময় মন্দির 

  • দুবরাজপুর কথা ও কাহিনী 

  • দুবরাজপুরের মন্দির 

  • হেতমপুর কাহিনী। চন্দ্রনাথ মন্দির। রাজবাড়ি 

  • কোটা - শীর্ষা 

  • টিকরবেতার পিতল শিল্পের কথা 

  • জয়দেব কেন্দুলী নিয়ে নানা লেখা 

  • রাধাবিনোদ মন্দির। মোহান্ত অস্থল এর পিতলের রথ, গীতগোবিন্দম এর জয়দেব 

  • মানুষ জয়দেবের খোঁজে 

  • ধর্মমঙ্গলের অন্যতম কবি নরসিংহ বসুএবং তাঁর  রাজনগর যোগ। 

  • ১৬৩৩ সালে নির্মিত ঘুড়িষার রঘুনাথজীর মন্দির এবং ১৬৩১ সালে মাসড়া গ্রামে তৈরি মন্দির। একটি তুলনামূলক আলোচনা। 

  • ঘুড়িষা গ্রামের দুই বিখ্যাত মন্দির 

  • ইলামবাজার। গঞ্জ ইলামবাজার কথা। 

  • ইলামবাজারের মন্দির 

  • ইলামবাজার কেন্দ্রিক নানা বিধ লেখা। 

  • 'তুলাপট্টিতে আর বসেনা নীলামের হাট '

আনন্দবাজার পত্রিকায় বড় প্রবন্ধ। 

  • সুরুল, রাইপুর, আদমপুর, চন্দনপুর, মির্জাপুর, সুপুর, ইটাণ্ডা নিয়ে নানা লেখা এবং ছবি। 

  • এছাড়াও যেখানের সম্বন্ধে হয়তো লেখা হয়নি সেখানের মন্দির টেরাকোটার ছবি। 

  • আপনারা জানেন মন্দির টেরাকোটা আমার অন্যতম প্রিয় বিষয়। বনকাটির মন্দির এবং ইলামবাজারের মন্দির দেখেই সেই বালক বয়সেই এই ভালোবাসার উন্মেষ। 

  • যেমন ইলামবাজারের আরস্কাইন সাহেবের কুঠিবাড়ির ভগ্নাবশেষ বা তাঁদের পরিবারের সমাধি ক্ষেত্র থেকেই,নীল ও গালা শিল্পের একদা বিখ্যাত কেন্দ্র সেই প্রাচীণ ইলামবাজার কে খোঁজা। ইলামবাজারের চারপাশ কে খোঁজা। যেমন ঊষহর, ধল্লা, দ্বারোন্দা, দেউলী, ইত্যাদি স্থান সম্পর্কে লেখা। 

  • এখনকার এই মাধ্যমের সুবিধা হচ্ছে 

দৃশ্য শ্রাব্য মাধ্যম। এখানে আছি দীর্ঘদিন। কয়েক হাজার ছবি নষ্ট হয়ে গেলেও, এখনও আছে কয়েক হাজার। 

  • বিরাট বিস্তৃত ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমার সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই আমি নির্দিষ্ট একটা ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চেয়েছি। 

  • প্রাচীণ গোপভূমের অন্তর্ভুক্ত পরগণা সেনপাহাড়ী এবং বীরভূমের সেনভূম তথা 

অজয় তীরের দুপারের মানুষের জীবন কথা। 

আমার সীমিত সামর্থে এই কাজটুকুই মাত্র করতে পেরেছি। 

আমার কোন উচ্চাভিলাষ নাই। আমি সামান্য এক আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চাকারী। ক্ষেত্রসমীক্ষক। কোন স্থান নিজের চোখে না দেখে, আমি কোন লেখা লিখিনা। 

আমি কোন 'মুখ' নই। যেমন " বীরভূমের মুখ "। কি "পুরুলিয়ার মুখ " বা "বাঁকুড়ার মুখ "। সে সামর্থ্য নেই। অনেক জ্ঞানী, পণ্ডিত, বিদগ্ধ লেখক  জনেরা আছেন। 

আমি আঞ্চলিক ইতিহাসের  গল্পকার, কথাকার। সমাজমাধ্যমের বন্ধুরা বলেছেন " সেনপাহাড়ীর কথাকার"

কেউ " সেনপাহাড়ীর কথক ঠাকুর " 

কেউ " জঙ্গলমহলের কথাকার "

এই রকম নানা অভিধা। যথেষ্ট। 

বাইরের বন্ধুরা জানেন আমি বীরভূমের। 

বীরভূম কি জানে কি জানি! 


যে সব সংকলন গ্রন্থে আমার বীরভূম বিষয়ক প্রবন্ধ গুলি প্রকাশিত হয়েছে 

তার একটা তালিকা যদি পারি, দেব। 

আপনাদের জ্ঞাতার্থে।  কিছু কাজ তো করেছি। ভবিষ্যৎ ই বলবে। 

অনেক ধন্যবাদ। নমস্কার। 

------------ ------------ ------------ ------------ ©  প্রণব ভট্টাচার্য। 

** ইলামবাজার কেন্দ্রিক আমার ছোট্ট বই টি র 

 নাম " এলেমবাজার নিলামবাজার ইলামবাজার "

দাম মাত্র ২০০/ টাকা। বন্ধুরা ঘরে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন। পরিবেশক অক্ষরযাত্রা প্রকাশনী র আনন্দ গোপাল হালদার। ফোন নং 9474907307. ফোনে অর্ডার দিলেই হল। 

------------ ------------ ------------ ------------ 

আমাকে ফেসবুকে ই পাবেন। অনুরোধ না জানালে কোথাও লিখিনা। ফেসবুক পেজে শুধু রিলের ভীড়। ওখানে লেখা কেউ পড়েননা। 

বাংলা ব্লগের তেমন চাহিদা নাই। তবুও একটা ব্লগ আছে। 

https:// matirpradip.blogspot.com 

ফেসবুক পেজ। Pranab's canvas 

ইউ টিউব চ্যানেল খুলেছিলাম। চালাতে পারিনি। 

এই। 

------------ ------------ ------------ ------------ ----






Thursday, 2 January 2025

কথা - সাতকাহন। তাঁ তি বাগান

সাতকাহনিয়া গ্রামের তাঁতিবাগান

এ গাঁয়ের বয়স কত! জিজ্ঞেস করলে প্রবীণরা বলতেন ' গাছ পাথর নাই ' বাবা । তার মানে সে অনেক পুরনো। কারা না ছিল! আজ আর তারা যে ছিল তার নিদর্শন বলতে তাদের বাস্তুবাড়ী গুলো এত দিনের জল,ঝড়, ঝঞ্জা,র আঘাতে  ছোট ছোট ঢিপি। এমন ছোট বড় ঢিপি তে ভর্তি  সেই পুরনো গাঁয়ের ' নামো পাড়া '। একটু নীচু। উত্তরে। নদীর অনেক কাছাকাছি। নদী মানে অজয় নদ। তখন নদী টার আজকের দশা হয়নি। বছরের কয়েক মাস নৌকো চলত। নীলবাড়ির মাঠ আছে। কলাবাগানের ঘাট আছে। নীল বাড়িতে নীলের চাষ হত। ঐ পুরনো গাঁয়ে নীলের চৌবাচ্চা ছিল। 
মানে নীল তৈরী হত। তাহলে নীলের ব্যবসা হত। 
কলাবাগানের ঘাট থেকে ইলামবাজার শিমূল তলার সাহেব ঘাট। সাহেব মানে আরস্কাইন সাহেব।ইলামবাজারের তাঁর বিশাল কুঠিবাড়ি। বিশাল ব্যবসা। নীল আর গালার। চারপাশ থেকে মাল আসত তার কুঠিবাড়ি সংলগ্ন গুদাম ঘরে। 
সে তো অনেক কথা। অনেক লিখেছি। 
ছিল তো সবাই। মানে আমাদের চলতি শব্দ 'সব জাতের। তাঁতিরা ছিল। আজ তাঁতিদের কথা। 
অন্যদের কথা পরবর্তী পর্ব গুলিতে। 
ছিল মানে ছিল প্রায় ষাট ঘর। তাই বলতেন পুরনো মানুষরা। ষাট ঘর! সোজা কথা নয়। 
নয় তো বটেই। 
 আসলে আমি ভাবছি এরা কি আদি থেকেই এই গাঁয়ের মানুষ। না কি অন্য জায়গা থেকে এসে এখানে তারা বসতি স্থাপন করেছিলেন। 
নদীর ওপারে ইলামবাজারের চৌপাহারী জঙ্গল যেখান থেকে আরম্ভ হচ্ছে সেখানে, অর্থাৎ এখনকার সুখবাজারে  রায়পুরের সিংহ বাবুরা এখানে তাঁতিদের এনে বসিয়েছিলেন। তাহলে কি অজয় পার হয়ে এখনকার সাতকাহনিয়া বা অযোধ্যা গ্রামেও তাঁতিদের বসিয়েছিলেন। হওয়া খুবই সম্ভব। 
 রায়পুরের সিংহ বাবুরা সুরুলের চীপ সাহেবের সাথে ব্যবসা করে বিশাল ধনী হয়েছিলেন। 
মেদিনীপুর এর চন্দ্রকোনা এলাকা থেকে শোনা যায় হাজার ঘর তাঁতি দের তাঁরা ওখান থেকে নিয়ে এসে এখানকার নানা গ্রামে তাদের বসতি গড়ে দিয়েছিলেন। ভাবলে কেমন লাগে। হাজার ঘর তাঁতি দেশ মাটি ছেড়ে এখানে এলেন। নিশ্চিত ভাবেই ভালো কিছুর আশায়। হাজার ঘর তাঁতি 
প্রতিদিন বোনেন' গড়া' কাপড়ের থান। গড়া কাপড় হচ্ছে ঠাসবুনোট, মোটা কাপড়। নৌকোর পাল হতে পারে আবার আজকের জিন্সের মতো 
সৈনিক দের পোষাক হত সেই কাপড়ে। 
ধবধবে সাদা করার জন্য ছিল অনেক ঘর ধোবা। 
এখনকার শান্তি নিকেতনের বিনয় ভবনের মাঠে ছিল ধোবাদের পাড়া। এখনও লালবাঁধে ধোবারা 
কাপড় ধোয়। সেই কাপড় কে ধবধবে সাদা করার জন্য চাই নীল। সুরুলের চীপ সাহেবের বিশাল, কুঠিবাড়ি। ছোট খাটো দুর্গের মতো চারপাশে ইঁটের প্রাচীর। 
জলাশয়, বাগান, বিশাল বিশাল সুন্দর খিলানের অনেক ঘর। একতলা, দোতালা। এই চীপ সাহেবই বীরভূমের প্রথম কমার্সিয়াল রেসিডেন্ট হয়ে এসেছেন। সিভিল সার্ভিস থেকে। বড়লোকের ঘরের ছেলে। মানুষ টিও ভালো। অন্য নীলকর দের থেকে তিনি আলাদা। 
সুরুলের সরকার বাবুরা-ও এই চীপ সাহেবের সাথে প্রথমে গড়া কাপড়ের ব্যবসা করেই বিরাট ধনী হয়েছেন। বানিয়েছেন দুর্গাদালান সমন্বিত বিশাল দোতলা চকমেলানো প্রাসাদ। সে তো অনেক কথা। 
রায়পুরের সিংহ বাবুদের জমিদারী ছিলো ইলামবাজার এলাকায়। ছিল তাঁদের বিরাট কাছারিবাড়ি। গুদামঘর। হাজার ঘর তাঁতি 
প্রতিদিন হাজার খানা গড়া কাপড়ের থান তাঁদের 
সরবরাহ করেন। আর সিংহ বাবুরা সেই হাজার খানা কাপড় সাপ্লাই করেন চীপ সাহেবকে। 
মাঝখানে তাঁদের আয় হয় প্রতিদিন হাজার টাকা। 
কমকথা নয়। তখনকার দিনে হাজার টাকা। 
তখনকার দিন মানে মোটামুটি দুশো বছর। 
চীপ সাহেব সুরুলে এসেছিলেন ১৭৮২  সালে। 
রায়পুরের সিংহ বাবুরা 
সুরুলের সরকার বাবুরা-ও কাছাকাছি সময়ে। 
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। 
বাবুদের কথা বলতে হলে অনেক কথা বলতে হবে। সেও না হয় হবে। 
এই গাঁয়ে আজ আর একঘর তাঁতি ও নাই। 
অযোধ্যা গ্রামে অনেক গুলি তাঁতি পরিবার। 
কোন ঘরেই অবশ্য তাঁত চলেনা। এখানের শেষ তাঁত বুনেছেন অযোধ্যার শ্যামবাজার অংশের 
বংশী শীল। আর অযোধ্যায় সম্ভবত কমল তাঁতি। পদবি দে। অযোধ্যা গ্রামে তাঁতিদের মধ্যে 
 দালাল পদবীর দুটি পরিবার ছিল। এই দালাল রা 
দালালী ই করতেন। তাঁরা স্বাভাবিক ভাবেই ধনী হয়েছিলেন। তাঁরা নিজেরা তাঁত বুনতেন না। 
লোক নিয়োগ করতেন। সব তাঁতিদের ঘর থেকে পাইকারি হারে কাপড় কিনে রায়পুরের সিংহ বাবুদের কাছে সরবরাহ করতেন। মাঝ খানে তাঁদের লাভ হত ভালোই। একটি দালাল পরিবার অবশ্য তাঁত বুনতেন তাই নয় শাড়ির পাড়ে ভালো নক্সা তুলতে পারতেন। তিনিই ছিলেন -
তাঁত প্রায় সব ঘরেই ছিল। ভালো গামছা বুনতেন কেউ। রেশম, তসর ও বুনতেন তাঁরা। 
সুরুল থেকে বা রাজনগর, তাঁতিপাড়া থেকে তসর, রেশম সুতো নিয়ে আসতেন। 
 এখানে সাদা সুতোর রঙ করে নিতেন। মোটামুটি 
পঞ্চাশ - ষাট বছর আগেও তাঁরা  ছিলেন। 
অযোধ্যা গ্রামে চেষ্টা হয়েছিল তাঁতিদের নিয়ে সমবায় গড়ার। তাঁতঘর তৈরী হয়েছিল। ভালো উন্নত মানের তাঁত আনানো হয়েছিল। এই সমবায় সমিতির উদ্যোক্তা ছিলেন প্রয়াত নারায়ণ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সহ তাঁর সময়কালের বিশিষ্ট মানুষরা। 
যদিও তাঁত বাঁচেনি। যে উদ্দেশ্য নিয়ে সমবায় সমিতি গঠিত হয়েছিল - সেই উদ্দেশ্যও  সফল হয়নি। এখন সেখান থেকে শুধু রেশন বিলি হয়। 
আমার মনে হয় সামগ্রিক ভাবে সমবায় আন্দোলন টাই মুখ থুবড়ে পড়েছে অনেক দিন আগেই। 
যাই হোক আমাদের কথা হচ্ছিল পশ্চিম বর্ধমান জেলার, কাঁকসা থানা এলাকার অযোধ্যা বনকাটি এলাকার, সাতকাহনিয়া, অযোধ্যা গ্রাম নিয়ে। 
অযোধ্যা গ্রামের তাঁতিরা সচ্ছল ই ছিলেন। পুকুর কাটিয়েছেন।  তাঁতি পুকুর নামেই তার পরিচয়। 
আমবাগান তৈরী করেছেন। অযোধ্যা গ্রামের উত্তরে বিশাল আমবাগান এই সেদিনও ছিল। 
তার পশ্চিম দিকের বাগান টি তাঁতিদের। 
সাতকাহনিয়ার তাঁতিরাও আম বাগান তৈরী করেছিলেন। একেবারে নিজেদের বাস্তু ভিটার কাছাকাছি। গ্রামের উত্তর পশ্চিমে। বিরাট এক পুকুর, নাম গোলামপুকুর। কোন এক গোলাম নিশ্চয়ই কিনে নিয়েছিলেন। গ্রামের পশ্চিম দিকে 
মুসলিম দের বাস। তাঁরা এসেছেন মোটামুটি - বছর আগে। তখন পুরনো গ্রামের ভগ্ন দশা। 
গ্রামের পূর্ব দিকের বিরাট আমবাগান। একদিন ছিল অধিকারী ব্রাহ্মণ দের। পরে বিক্রি হয়ে যায়। 
মুসলিম আর তাম্বুলী সম্প্রদায়ের হালদার পরিবার কিনে নেন। 
অধিকারী রা এই গ্রাম পরিত্যাগ করেন। অন্যদের দাপটের ভয়ে। 
তাঁতিরা যে কে কোথায় গেলেন। অনেকে যে মারা গিয়েছেন তাতে সন্দেহ নাই। কেননা মারাত্মক কলেরা, প্লেগ,এক ধরনের ম্যালেরিয়া, যার নাম বর্ধমান জ্বর আছড়ে পড়েছিল সমগ্র এলাকাতেই। 
অনেকে মারা গেছেন। আর যাঁরা বেঁচে ছিলেন তাঁরা যে যেদিকে পেরেছেন পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। জমি, পুকুর, বাগান যা যেটুকু ছিল জলের দামে হয় বেচে দিয়ে গেছেন। কিম্বা অন্যরা 
যাঁরা তখন প্রভাবশালী হয়েছেন তাঁরা দখল করে নিয়েছেন। 
এই গ্রামে এক সৈয়দ বংশীয় সুফি সাধক, সৈয়দ শাহ তকী সাহেবের পুত্র সৈয়দ শাহ আলী জাওয়াদ, খুষ্টিগিরি থেকে এই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আনুমানিক - বছর আগে। 
তিনি ইউনানি চিকিৎসা ভালো জানতেন। বর্ধমানের রাজার মারাত্মক পিত্তশূল ভালো করে দিয়ে রাজাদের কাছ থেকে অনেক ভূসম্পত্তি লাভ করেন। অনেকে বলেন প্রায় সাতশো বিঘা, মতান্তরে চোদ্দশো বিঘা। সেই জমি চাষ করাবার জন্য এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে নিয়ে আসেন জোলা মোমিন মুসলমানদের। যাঁদের পূর্ব পুরুষরা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। ছিলেন সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ। 
ইংরেজ দের সাথে এই সৈয়দ বংশীয় দের খুবই সুসম্পর্ক ছিল। 
গোলামপুকুরের আগের নাম কি ছিল তা জানা যায়না। কিন্তু আমার দৃঢ় অনুমান অন্য নাম ছিল। 
অসম্ভব নয় এটা তাঁতিদের কাটানো। নাম তা হলে হওয়া উচিত তাঁতিপুকুর। 
কেননা এই পুকুরের উত্তর পশ্চিম পাড়ে বাস ছিল তাঁতিদের। পুকুরের উত্তর পাড়ে লম্বা লম্বা তালগাছের সারি। একটা চারআঁটির কালো কুচকুচে, খুব মিষ্টি তালের গাছ। সেই তাল কুড়োবার জন্যে আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা থাকত। 
তাঁতি বাগান  যে বিরাট ছিল তা নয়। কমবেশী কুড়ি পঁচিশ টা আম গাছ। 
তাদের মধ্যে সেরা আমগাছটি ছিল বিরাট মহীরুহ। আর তার ফল ছিল অপূর্ব স্বাদ গন্ধের 
' খইনাড়ু ' আম। একেবারে নাড়ুর মতো গোল তার ফল। সেই আম কুড়োবার কি ধূম না ছিল। 
কাছেই কোঁড়া পাড়া। তারাই কুড়িয়ে নিত। আমরা দু চারটে পেতাম। আহা, কি অপূর্ব ছিল সেই আম। 
এই গ্রামের তাঁতিপাড়া, বা তাঁতি বাগানের সর্বশেষ জীবন্ত প্রতিনিধি ছিল সেই আমগাছটি। 
অন্যরা আগেই গেছে। হালদার বাবুরা কেটে বিক্রি করছেন। 
আমরা তখন ছোট। ভাবতাম নিশ্চয়ই এই গাছটাতে কেউ হাত দেবেনা। পুকুরের উত্তর পাড়ের তালগাছ গুলো আর একটাও নাই। 
অন্যান্য গাছ বলতে ছিল বেশ কয়েকটা খেজুর, 
কয়েত বেল , পলাশ সেসব ও পরিষ্কার হয়ে গেছে। 
 বাবুরা  এক এক করে সব  বেচে দিয়েছেন। 
বাকী ছিল এই বিশাল আমগাছ টি। 
তারপর একদিন তারা এলো। গাছ কাটা দের দল। 
তাঁবু পাতল কাছেই। রান্না বান্না, থাকা খাওয়ার জন্য। দড়ি, দড়া, বিশাল লম্বা লম্বা করাত। 
দাঁত গুলো তাদের চকচক করছে। 
গাছটির মোটা মোটা শাখা প্রশাখা গুলি আগেই কাটা পড়ল। সারা দিনরাত করাতের ঘ্যাসঘ্যাস আওয়াজ। 
আমাদের মাটির দোতালা নীচু ঘরের উপর কোঠায় ছোট্ট জানালার ধারে পড়তে বসি। রাতে সামনে হ্যারিকেন। ডালপাল গুলিকে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে। করাতের নির্মম শব্দ। সামনে হ্যারিকেন জ্বলে। বই খোলা থাকে। পড়া হয়না। 
কানে বাজে শুধু করাতের শব্দ। আমার ছোট মনে কেবলই পাক খায় ' কেন কাটল, কেন কাটল এই 
আমগাছটিকেও। তখন কি আর বুঝি বাবুদের অনেক টাকার দরকার। এখনই কেটে বেচে দাও। কি জানি পরে কি হয়! সময়কাল সত্তরের দশকের প্রথম ভাগ। চারদিকে চলছে বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ। বাবুরা সব বেচে দিচ্ছেন। বাবুদের বড় লোভ। 
তারপর একদিন তার গুঁড়ি তে করাত চলল। দড়ি দড়া বেঁধে টান দেওয়া আছে উত্তর দিকে। 
 কত মানুষের নানা কসরত। গাছ কাটার নানা কায়দা কানুন আছে তো। 
বিশাল আর্তনাদ করে সে একসময় ভূপাতিত হল।
 গিয়ে দেখলাম। পড়ে আছে তার কাটা দেহ। 
আর গুঁড়ি থেকে বের হচ্ছে লাল রস নয়, যেন টকটকে লাল রক্ত। 
তাঁতিবাগানের শেষ প্রতিনিধি কে নির্মম ভাবে হত্যা করা হল। শুধু আমাদের কারও কারও মনে হয়তোবা  রয়ে গেছে সেই ' তাঁতি বাগান ' আর তার সেরা ' খই নাড়ু আমগাছ ' টি কে। 
------------ ------------ ------------ ------------ ------------ 

 কথা - সাতকাহন।  আমবাগান  , তালসারি অধ্যায় 
ছবি। অন্য এক গ্রামের পুকুরপাড়ে তাল গাছের সারি। এমনটাই ছিল এই গ্রামেও।

চলুন ঘুরি চারপাশ। মেলা দেখা তার সাথে একটা হেরিটেজ ট্যুর

।। মজাটা কি জানেন।। 
 মজাটা এখানেই যে যতই শপিং মলে যাই,মেলার এক আলাদা আকর্ষণ আছে। মেলা মেলাই। মেলার বিকল্প মেলা। মানুষে মানুষে মেলা। মেলার মাল বলে  কেনাকাটা হয়তো তেমন করিনা।  আবার দেখুন শান্তি নিকেতনে এলে সোনাঝুরি র হাটে যাওয়া, কেনাকাটা করায় বেশ মজা। 
 আমাদের আনন্দ কিন্তু হাটে, মেলায়, ফুটপাতের কেনা কাটায়। গড়িয়াহাটের ফুটে কি না পাওয়া যায়। যে ক্যানভাসের থলি টা পঞ্চাশ টাকায় কিনতে পাওয়া যায় 
সেই ধরনের , পাতলা মার্কিন কাপড়ের থলে, । এই ধরুন ছোট খোকা বলে অ, আ। হামাগুড়ি দিচ্ছে বাচ্চাটা। নন্দলালের বিখ্যাত আঁকা। তার প্রিন্ট
আছে ব্যাগের উপরে। নন্দন মেলায় তার দাম  দেড়শ দুশো টাকা। বলে দিলেই হচ্ছে। নন্দন মেলা বলে কথা। এসেছেন না কি নন্দন মেলায়। হয় ডিসেম্বরের ১ এবং ২ তারিখে। 
 এখানে দামটা বড় নয়। মেলার স্মারক। কিন্তু আমরা অনেকে কিনতে পারিনা। ক্যালেন্ডার, কিছুই নাই, একটা আঁকাও  পছন্দ না হলেও তার দাম দুশো, আড়াইশো। কি করে কিনব। ইচ্ছে থাকলেও পারিনা। শান্তিনিকেতনের মেলায় জিনিসের বড়ো দাম। অনেকে বলেন। আমিও বলি। মেলা দেখা নিশ্চয়ই হয়ে গেছে। তবে চলুন। 
আর কেন এসব নিয়ে কচকচ করা - 

 যাক এসব কথা বাদ দিন। আসি অন্য কথায়। 
শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা দেখতে এসে চারপাশে একটা হেরিটেজ ট্যুর সেরে অনেকে ফেলেন। নিজেদের গাড়ি থাকলে কথাই নেই। তা না হলে অটো, টোটো, ভাড়া গাড়ি। যে যেমন পারে টাকা নিয়ে নেয়। 
 একটা রেট থাকা দরকার। আমাদের সকলেরই মনোভাব, আরে বাবা , ঠিক আছে, বছরের এই সময়টা তো মাত্র। দু পয়সা বাড়তি রোজগার করুক 
 সুরুল সরকার জমিদার বাড়ি,রাইপুর সিংহ বাবুদের ভগ্ন প্রাসাদ, সুরথেশ্বর শিব তলা হয়ে, বিশ্ববাংলা কে পাশে রেখে সুপুরের টেরাকোটা অলংকরণ যুক্ত মন্দির, করে ইটাণ্ডা পর্যন্ত অনেকে সেরে ফেলেন। এই সব স্থানের তো অনেক গল্প কথা আছে। আছে ইতিহাস। ইতিহাস টা জানায থাকলে 
বেড়ানো  আনন্দ টা  বেড়ে যায়। আর আমি বা আমাদের মতো আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চাকারী রা চাই 
আপনারা ইতিহাস টা জানুন। সব মাটির নিজস্ব ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস উপেক্ষার নয়। 
মাটিকে না জানলে মানুষ কে চেনা যাবেনা। 
যাক। এই হল আমার শুরুর কথা। সারা জীবন এই কাজ করে গেলাম। কোন প্রাপ্তির আশা ছাড়া। 
যদি এই সব স্থানের কথা কাহিনী শুনতে চান তবে আমাকে ফলো করবেন। 
আজ তবে ইটাণ্ডার কথা বলি। শুদ্ধসত্ত্ব বাবু বলেছেন। 
 তাঁকে ধন্যবাদ। আমার সাথে এগারো মাইল থেকে 
মেলা পর্যন্ত এসেছেন। চলুন যাওয়া যাক ইটাণ্ডা। 
 
 ।।  ইটাণ্ডা র কথা ও কাহিনী।। 
 নদী সরে গেছে অনেক দক্ষিণে। নদীপাড়ে অঢেল সব্জি। 
 উর্বর পলি মাটি। একদা এই নদী বইত উত্তরে বাজারের গা ঘেষে। কত মালের ওঠানামা। নীল, গালা,  সুতী বস্ত্র ( গড়া কাপড়)  হাড়ের চিরুনি, মশলাপাতি, পিতল কাঁসার তৈজস পত্র প্রভৃতি দ্রব্যাদি সওদাগরি নৌকায় চেপে চালান যেত নানা জায়গায়। ইটাণ্ডা ছিল এক নদী তীর বর্তী জমাট বাণিজ্য কেন্দ্র। বলছি নদী কিন্তু নদ। অজয়। 
 তখন কোথায় বোলপুর! 
 অনেকে বলেন  ইষ্ট ইণ্ডিয়া র অপভ্রংশ ইটাণ্ডা। 
 তাহলে কি তার আগে ইটাণ্ডা ছিলনা। বা কি ছিল তার নাম! প্রশ্ন জাগে। 
 তখনকার বিখ্যাত  জায়গা সুপুর,  সুরুল, ইটাণ্ডা। 
 ইটাণ্ডা ছিল অজয়ের দক্ষিণে। বর্ধমানের দিকে। এখন সেই মজা নদীখাত এক নোংরা খাল মাত্র। 
 আজ আর সেই ইটাণ্ডা নাই। ইটাণ্ডার কথা বলার মতো বয়স্ক মানুষ ও হয়তো নাই। 
 একদিনের বনেদী ব্যবসায়ী পরিবারের কর্তা পীযুষ কান্তি  সাধু র সাথে কথা বলছিলাম। এঁরা তো ছিলেন সাধু খাঁ। খাঁ টাকে কখন যে ত্যাগ করলেন। বেণে পরিবার। যথেষ্ট সম্পন্ন, এবং প্রভাবশালী পরিবার ছিলেন নিশ্চিত ভাবেই। খাঁ  উপাধি পেয়েছিলেন। 
 ইটাণ্ডা মন্দির টেরাকোটা প্রেমী দের কাছে খুবই জনপ্রিয়। 
 এখানকার  জোড়বাংলা রীতি র কালীমন্দির এর টেরাকোটা অলংকরণ 
 অনবদ্য। জোড়বাংলা রীতি র এমন মন্দির কমই দেখা যায়। 
 দ্বিতল বিষ্ণু দালান। তার স্তম্ভে খিলানে ঐশ্বর্য। আর অতি চমৎকার  কলমকারি র ( স্টাকো) কাজ তার দেওয়ালে। 
 উপরের ছাদ ভেঙে পড়ছে। সংস্কার করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই সাধু পরিবারের নাই। নানা শরিকের নানা মত। 
 ১২২২ এবং ১২৩৫ সালে নির্মিত শিবমন্দির দুটি। কালীমন্দির 
 নির্মান ও সমসাময়িক। বিশাল অশ্বত্থ তলে সম্ভবত প্রাচীন কোন নির্মানের উপরে নির্মিত হয়েছিল প্রাচীণ এক মন্দির। 
 অশ্বত্থের মায়া বাঁধনে বাঁধা। বাউরি পাড়ায় একটি ছোট চালা রীতি র শিবমন্দির। একেবারে ই ভেঙে পড়ার অবস্থা। 
  বীরভূমে বর্গীর আক্রমণ এবং অত্যাচার ছিল প্রবল। 
 সিউড়ি র কাছে কেন্দুয়াডাঙ্গায় ছিল তাদের প্রধান ঘাঁটি। 
বারবার তারা ইটাণ্ডা কে লুঠ করেছে। 
 এক জোড়াল খাঁ হিন্দু মুসলমান সকলকে একত্রিত করে 
মাটির গড় বানিয়ে, সৈন্য দল তৈরি করে বর্গী আক্রমণ প্রতিরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিন বারের লুঠে ইটাণ্ডা তার হৃতগৌরব আর ফিরে পায়নি। অনেক ব্যবসায়ী এখান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। 
 সুপুরে ও আনন্দ চন্দ্র গোস্বামীও বর্গী দের রুখে দিয়েছিলেন। 
  ১২০০ বঙ্গব্দের আশেপাশে র সময় কাল দুর্যোগের ঘনঘটায় 
 আচ্ছন্ন।। সেই সময়কাল। ছিয়াত্তর এর মন্বন্তর, মন্বন্তর পরবর্তী  পরিস্থিতি। ডাকাত দলের অবাধ ডাকাতি। বর্গী আক্রমণ , ইউরোপীয় বণিকগন। খুব সং ক্ষেপে তাকে একটা প্রবন্ধে ধরা কঠিন ই কাজ। তবু লিখেছি ছোট কাগজে।   সেই সময়কাল নিয়ে অনেক গুণী মানুষ কাজ করেছেন। তাঁদের সাহায্য ছাড়া কাজ করা যায়না। 
 অজয়ের এপার ওপার  আমার কাজের ক্ষেত্র। আপনারা জানেন। এপারে দক্ষিণে সেনপাহাড়ী আর ওপারে উত্তরে সেনভূম। মাঝে বয়ে চলে অজয়। প্রাচীনা অজাবতী। 
 ------------ ------------- ------------ ------------ ------------ ------------ 
 বোলপুর থেকে সহজেই যাওয়া যায়। বোলপুর পালিতপুর রাস্তার নিমতলা মোড় থেকে দক্ষিণে কয়েক কিমি।
সাথে ছিল - অঙ্কুশ দাস। গবেষক। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

চলুন যাওয়া যাক গল্প করতে করতে

।। চলুন ফেরা যাক।। 
তাহলে এবার ফিরতে হয়।আর কেন। বেশ হল। ভালোই তো। এসেছিলাম শান্তি নিকেতনের মেলা। আর যদি হয়ে যায় একটু এদিক ওদিক ঘোরা। এই সুরুল, রাইপুর, সুপুর, ইটাণ্ডা, এই সব জায়গায়। বেশ একটা হেরিটেজ ট্যুর এর মতো। 
তো প্রণব বাবুর সাথে গল্প করতে করতে ইটাণ্ডা হল। বেশ ভালো লাগলো। 
শুধু ইটাণ্ডা কেন সবগুলিই হল। নিজেদের গাড়ি ছিল।  ফিরতে তো হবেই। সপ্তাহ অন্ত হল যে। 
 সেই এগারো মাইলে এসে আবার  প্রণব বাবুকে সাথে পেলাম।  এবার ওঁর কথা শুনতে শুনতে চলেছি পানাগড় এর পথে। রাজ্য সড়ক। পানাগড় মোরগ্রাম হাইওয়ে। 
,, আমরা দাঁড়িয়ে আছি সীমান্ত রেখায়। বুঝলেন। 
 এই রাস্তা সীমান্ত। এর পূর্বে, ঐ দেখুন রাস্তা চলে গেছে আদুরিয়া অমরপুর এর হয়ে আরও পূবে। 
থানা - আউসগ্রাম। গুসকরা মোড় থেকে চমৎকার বনপথ চলে গেছে গুসকরা বা ভেদিয়ার দিকে। 
কালিকাপুর মৌখিরা আছে ঠিক এই নীলকুঠীর জঙ্গলের খোয়াই এর নীচে। প্রাসাদ আর মন্দির নগরী। না দেখা থাকলে দেখতেই হবে 
আর ঐ দেখুন রাস্তা চলে গেছে অযোধ্যা বনকাটি হয়ে আরও পশ্চিমে গড়জঙ্গল, ইছাই ঘোষের দেউল পার হয়ে আরও পশ্চিমে। কাজলাডিহি নবগ্রাম , শিবপুর দুর্গাপুর  রাস্তাপর্যন্ত।  পাশে পাশে  অজয়। 
অজয়ের ওপারে মানে উত্তর পাড়ে জয়দেব কেন্দুলী। বেশী দূরে নয় কিন্তু। বীরভূমে। 
কি জানি মেলার সময় এসেছেন কি না। 
এই পথের পাশেই আছে " তেপান্তর নাট্য গ্রাম "
যদি না এসেছেন, একবার এসে নিজের চোখে ই  দেখবেন। বেশী এখানে বলছিনা। 
রাস্তার এপারে মানে পশ্চিমে কাঁকসা থানা। 
অর্থাৎ দুটো থানা এলাকার সীমানা আমাদের এই বড় রাস্তা পানাগড় মোরগ্রাম হাইওয়ে। 
জঙ্গল শুরু হবার আগে বাঁদিকে মাজুড়িয়া গ্রাম। 
আর ডানদিকে রঘুনাথপুর গ্রাম। 
আদুরিয়া। বড়ো আদর করে রাখা নাম। কি বলুন। 
সার্ভেয়ার জেনারেল রেণেল সাহেবের ম্যাপে (১৭৬৯) আদুরিয়ার উল্লেখ আছে। পথ চলে গেছে 
আদুরিয়ার পাশ দিয়ে ভাতকুণ্ডা মানকর হয়ে বর্ধমানের দিকে। 
আর পশ্চিম দিকে সেই রাস্তা সেনপাহাড়ি র ভিতর দিয়ে। এই পশ্চিম প্রান্তের কোন গ্রাম নামের উল্লেখ নাই। একটু অবাক লাগে। গোটা টাই জঙ্গল দেখানো আছে। অজয় পার হয়ে সে রাস্তা চলে গেছে রাজনগর এর দিকে। 
ইছাইঘোষের দেউল আছে। অযোধ্যা বনকাটি র মতো জনপদ আছে। সাতকাহনিয়া আছে। 
গৌরাঙ্গপুর আছে। বা সেদিনও ছিল। মাথা উঁচু করেই ছিল। কেন ম্যাপে কোন স্থান উল্লেখ নাই। আমাকে ভাবিয়েছে খুব। হয়তো তাঁর সহকারী রা 
 উল্লেখযোগ্য নয় ভেবে ভুল করেছেন। 
যাই হোক আমাদের পূব দিকে ঐ যে আদুরিয়া অমরপুর শ্রীচন্দ্রপুর গ্রাম। সম্পন্ন গ্রাম ছিল আদুরিয়া। 
অমরপুর এর পিতল শিল্পের খ্যাতি ছিল খুব। 
দেবী অমরচণ্ডী র নামে অমরপুর। 
পিতলের দ্রব্যের কারিগররা ছিলেন খুবই দক্ষ। 
বিখ্যাত উখরার হাণ্ডা জমিদার বাবুদের পিতলের রথের প্রধান কারিগর ছিলেন রাধাবল্লভ মেহতরী। 
নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবেনা। এত সুন্দর তার অলংকরণ। 
কবিরাজ রা খুবই ধনী ছিলেন। ঝুড়ি ভর্তি মোহর 
জলে ধুয়ে ছাতে রোদে শুখুতে দিতেন 
গোটা পাড়া জুড়ে ছোট ছোট চালা রীতির শিবমন্দির। আবার পাশাপাশি মুখোমুখি দুটি 
শিখর দেউল শিবমন্দির। আর ছিলেন বিষ্ণু। 
এক পরিবারে নৃসিংহ দেবতার ক্ষোদিত মূর্তি পূজিত হন। মিলিত ভাবে অমরপুর আদুরিয়া
ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এক গ্রাম। 
মাজুড়িয়ার কথা। জুড়ি নাই যার। টোল শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। 
রঘুনাথপুর সম্পন্ন গ্রাম ছিল। 
রঘুনাথপুর থেকে ঐ যে পশ্চিমে পিচ রাস্তা চলে গেছে মলানদিঘী হয়ে দুর্গাপুরের দিকে। মলানদিঘী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। 
কেন গুরুত্বপূর্ণ! বলতে গেলে আরও একটু সময় লেগে যাবে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এবং পেশগত শিক্ষার নানা প্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে উঠেছে।
রঘুনাথপুর এর জঙ্গল বড় নয়। পার হয়ে এলাম। 
বাঁদিকে বেলডাঙা গ্রাম। ব্যতিক্রম। এ গ্রাম আছে 
বড় রাস্তার পূর্বে। এই বেলডাঙা থেকে রাস্তা চলে গেছে ধানতোড় কে পাশে রেখে ছোট রামচন্দ্রপুর, আড়জুড়ি, তিলং, রাঙাখুলা। আপনাদের মনে হবে বড়রাস্তা থেকে এত ভিতরে এই সব গ্রাম আছে! যাইহোক 
এবার পিয়ারীগঞ্জ, আর পশ্চিমে তেলিপাড়া। 
বর্ধমানের এক রাণী প্যারীকুমারী র নামে পিয়ারীগঞ্জ। পুরনো গ্রামে অনেক শিবমন্দির ছিল। 
তেলিপাড়া। তাবলে তেলিদের গ্রাম নয়। তেলিরা আছেন বটে। গাছতলায় আছেন দেবী তিলাইচণ্ডী 
বা তিলুইচণ্ডী। সেখান থেকে তেলিপাড়া। 
এই দেখলেন, কখন হুস করে পেরিয়ে গেছি ছোট্ট কুনুরের সেতু। ছোট্ট কুনুর এখানে একটা নালার মতো। কিন্তু আরও নীচে বেশ চওড়া। অতিবৃষ্টি হলে ভাসায়। এমনকি গুসকরা শহরের  নীচু এলাকা জলমগ্ন হয়। এই গুসকরা শহরের উপর দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা চলে গেছে। গরম সামান্য বেশী অনুভূত হয়। 
দোমড়া। দুই মোড়ের জায়গা। আবার কেউ বলেন ডোম রা। এখানের বৈষ্ণব আশ্রম টি প্রাচীণ। 
গ্রামের ভিতরে আছে একটি শিবমন্দির। বাইরে একটি চাঁদনী রীতির বিষ্ণু দালান। এখানেরামকৃষ্ণ আশ্রমের শাখা কেন্দ্র আছে। 
বর্ধমানের রাজা ত্রিলোক চন্দ্রের নামে গ্রামের নাম ত্রিলোকচন্দ্রপুর। অনেক বিশিষ্ট, সম্পন্ন পরিবার এখানে আছেন। পাল পরিবারের খ্যাতি ছিল নানা ব্যাধি উপশমের জন্য আয়ুর্বেদিক তেল তৈরী তে। 
পূর্ব দিকে রাস্তা চলে গেছে দেবশালা হয়ে মানকরের দিকে। দেবশালার প্রাচীন নাম রাজগড়। তার মানে বুঝতেই পারছেন যে একটা গড় ছিল। তাবলে এ গড় রাজস্থানের দুর্গ নয়। 
মোটা ইঁটের প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। 
রাজগড়ের অনেক গল্প কথা। পরে হবে। আচ্ছা আপনারা কাগজে হয়তো লবনধার গ্রামের নাম শুনেছেন। ভুল ভাবে বলা হচ্ছে আল্পনা গ্রাম। 
আলপনা নয় বরং বলা উচিৎ " চিত্রিত গ্রাম। "
আপনারা যাঁরা শহরে থাকেন তাঁরা ভাবতেই পারবেন না ঐ মাঠ, জঙ্গলের ওপারে এমন সব সম্পন্ন, সমৃদ্ধ গ্রাম আছে। 
যাই হোক শুরু হল ধোবারুর জঙ্গল। এই জঙ্গল কে বলা হয় " সাতকাটার জঙ্গল "। সেই সময়ে মানে মাত্র দুশো বছর আগে জঙ্গল ছিল জঙ্গলই। 
আর চোর, ডাকাত, রাও ছিল। এই জঙ্গল ই তো ছিল তাদের ডেরা। কার বা কাদের হাতে সাতজন কাটা পড়েছিলেন। তার কোন নথি নাই। 
অনুমান বৈদেশিক আক্রমণের মুখে পড়ে কাঁকসা রাজবংশ ধ্বংস হয়। সৈয়দ বুখারী ছিলেন তাঁদের নেতা। প্রবল যুদ্ধের শেষে কাঁকসা পরাজিত হয়। 
সেই সময়ের ঘটনা হবার সম্ভাবনা বেশী। রাজবংশের সাত সৈনিক বা পাহারাদার, বা সেনাপতি বা রাজবংশের সাত ব্যক্তি যাঁরা হয়তো যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন, তাঁরা অতি দ্রুতগামী অশ্বের সামনে দাঁড়াতে পারেননি। নিহত হয়েছিলেন। 
এই আমাদের এখনকার কাঁকসা থানা এলাকা সেদিনের পরগণা সেনপাহাড়ী। সেন রাজাদের পূর্ব পুরুষ রা এসে গড়জঙ্গলের গভীরে সম্ভবত রাজা 
কর্ণসেনের আশ্রয় নিয়েছিলেন। কর্ণসেন ছিলেন পাল রাজাদের সামন্ত। মেদিনীপুর এর ময়নায় ছিল তাঁর আসল রাজত্ব। তিনিও দক্ষিনী। সেন রাজাদের বাঙ্গলায় আদি বাসস্থান হিসাবে এই এলাকার নাম হয়ে যায় 
" সেনপাহাড়ী "
চলুন, প্রায় এসে গেছি। জঙ্গলের ভিতরে ভিতরে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের রাস্তা,রানওয়ে,  নানা নির্মান। একটু দূরেই বিমানঘাঁটি। 
রেল লাইন স্থাপনা কে কেন্দ্র করে পানাগড় বাজারের গড়ে ওঠা। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে 
আদি জি টি রোড। 
কাঁকসা প্রাচীণ জনপদ। রাজা কঙ্কসেন - কনকসেন থেকেই কাঁকসা নাম এসেছে। এই এক মত। আর এক মত কাঁকসা তাঁদের পদবী। 
যেমন ভবানীপতি কাঁকসা। তাঁর নাম থেকে কাঁকসা। 
এসে গেছি পানাগড় রেলস্টেশনে। 
এবার ট্রেন আসার দেরি আছে। বসে বসে মনে মনে এঁকে ফেলুন ছবি। সাল ১৮৫৫। রেল চালু হল হাওড়া থেকে রাণীগঞ্জ। পানাগড় স্টেশন হল। 
আজকের স্টেশন রোড হল মাটি মোরামের রাস্তা। 
চলে গেছে কাঁকসা ডাকবাংলোর পাশ দিয়ে উত্তরে এগারোমাইল, ইলামবাজারের দিকে। 
দাঁড়িয়ে আছে গোরুর গাড়ি। খড় চিবুচ্ছে বলদ দুটো। গাড়োয়ান জল খেতে গেছে পাকুড়তলার ময়রাদের দোকানে। ভালো বাতাসা, কদমা, মণ্ডা পাওয়া যায়। 
বেশ আসুন। আবার আসবেন। এবার যখন আসবেন এই গোটা এলাকা টা চক্কর দেবেন। 
আর যদি আমাকে সঙ্গে পেয়ে যান। "
–------------ ------------ ------------ ------------ 
------------ ------------ ------------ ------------ 
©  প্রণব ভট্টাচার্য। 
হ্যাঁ, একটা কথা বলে নিই। প্রণব বাবুর লেখা একটা ছোট্ট বই আছে। ইলামবাজার কে কেন্দ্র করে কুঠিবাড়ি ভিত্তিক সেদিনের নীল গালা সুতী বা রেশমের  ব্যবসা 
নাম।  এলেমবাজার নিলামবাজার ইলামবাজার। দাম মাত্র দুশো টাকা। 
অক্ষর যাত্রা প্রকাশনীর আনন্দগোপাল হালদার কে ফোনে অর্ডার দিলেই বাড়িতে বসে বই টি সংগ্রহ করতে পারেন। 
ফোন নং 9474907307 
কেন বললাম, না এখানে ইলামবাজার, দ্বারোন্দা, সুরুল, রাইপুর, সুপুর সবার কথা এই বইয়ে আছে। 
পড়ে দেখবেন। আশা করি ভালো লাগবে। অনেক তথ্য আছে। এপার ওপার অজয়ের দুপারের কথা ই আছে। 
-----* আপনারা কিনে পড়লে দ্বিতীয় সংস্করণ টি 
 করতে পারি।   নমস্কার । 
গল্প শুনছেন। "  সেনপাহাড়ীর কথক ঠাকুর " কে কিছু দক্ষিণা দেবেননা!! 
বছর শেষ। আজ ৩১ শে ডিসেম্বর। ২০২৫ এর শুভেচ্ছা কামনা করি। সবাই ভালো থাকুন।। 
এই পর্যায়ের আরও দুটি পর্ব ও৷ পড়ুন। 
আমি তো গল্পবলিয়ে। 
------------ ------------ ------------ ------------

Thursday, 26 December 2024

চলুন, গল্প করতে করতে শান্তিনিকেতনে যাই

চলুন আপনাদের সাথে গল্প করতে করতে শান্তি নিকেতনের পৌষ মেলায় যাই। এই এগারো মাইল 
নামের বাসস্ট্যান্ড থেকে আমি আপনাদের সঙ্গী হলাম। আচ্ছা বলুন এগারো মাইল নামটা বেশ অন্যরকম কি না। তাহলে এই নামের পিছনে একটা গল্প আছে। কি গল্প!  না কাঁকসা থেকে 
 ১১ মাইল দূরে এই স্থান। নাম ই হয়ে গেল  পাকাপাকি। তখন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। কাঁকসা পানিঘর থেকে এগারো মাইল দূরে যে মোরাম রাস্তা চলে যাচ্ছে সাতকাহনিয়া ডাকবাংলো য়। এক ডাকবাংলো থেকে পরবর্তী ডাকবাংলো। ডাকবাংলোয় বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে। আস্তাবল আছে। ঘোড়ার দানাপানির ব্যবস্থা আছে। 
সরকারি কর্মচারী দের জন্য ইংরেজ সরকারের 
ব্যবস্থা। প্রথম দিকে ডাক পরিবহনের কাজ ও চলেছে। ডাক পরিবহনের কাজের মানুষ টির জন্য আলাদা ছোট একটা কোয়ার্টার আছে। টিনের বা টালিরও ছাউনি হতে পারে। সেখানে বিশ্রামের ব্যবস্থা। মনে পড়ে গেল শের শাহ ও মোটামুটি এগারো মাইল দূরে দূরে চটি, র ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। চটি মানে যেখানে সেই বিশ্রামের ব্যবস্থা পাওয়া যাবে। আস্তাবল পাওয়া যাবে। দানাপানির ব্যবস্থা হবে। আরও কিছুরও হতে পারে। 
যাক এই তো হল এগারো মাইল কথা। 
ঐ দেখুন পূর্ব দিকে শালের জঙ্গল। আঁকাবাঁকা পিচ ঢালা পথ চলে যাচ্ছে গুসকরা বা ভেদিয়া পর্যন্ত। চমৎকার জঙ্গল পথ। 
গিয়েছেন নাকি কালিকাপুর মৌখিরা।
এই গুসকরা মোড় থেকে মাত্র চার পাঁচ কিমি দূরে ই।কালিকাপুর। সেখানের  ভগ্ন বিশাল সাত মহলা দালান। পাশাপাশি দুটি শিবমন্দির। চমৎকার টেরাকোটা অলংকরণ সমন্বিত। 
চলুন এবার চাঁদনী কে পাশে রেখে মৌখিরা যাই। 
চাঁদনী ছিল ইংরেজ সাহেবদের সাথে কালিকাপুরের জমিদার বাবুদের একসাথে আনন্দ স্ফূর্তি করার জায়গা। 
তখন জমিদার  বাবুরা, ইংরেজ দের সাথে একজোট হয়ে নীলের ব্যবসা করে বিশাল ধনী হচ্ছেন। 
মৌখিরা কে বলা যেতে পারে মন্দির নগরী। প্রাসাদ আর মন্দিরে মন্দিরে ভরা। 
শতাব্দীপ্রাচীন পুষ্পিত অশোকতরু তলে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকান। ইতিহাস আপনার মনে ফিসফিস করে কথা বলবেই। 
কল্যাণচকের এই প্রাঙ্গণে একসাথে রয়েছে অনেক গুলি মন্দির। ১২০০ বঙ্গাব্দ থেকে শুরু হয়েছে মন্দির নির্মান। এখানের বিষ্ণু মন্দিরের গায়ে চমৎকার টেরাকোটা প্যানেল আছে। 
বসুধা য় এসে বড় রাস্তা ধরে এবার উত্তর পূর্ব মুখী
সামনেই অজয়। প্রাচীন নাম যার অজাবতী বা অজমতী বা অজয়াবতী। হয়তো ঋজুপালিকা। 
অজয়ের পুরনো সেতু বয়সের ভারে ক্লান্ত হওয়ায় 
নূতন ' অজেয় সেতু ' নির্মিত হল। ১৯৬২ তে উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিধান চন্দ্র রায়। 
এই অজয়কেই  ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী কাগজে কলমে ১৮০৬ সালে বীরভূম আর বর্ধমানের প্রাকৃতিক  সীমারেখা হিসাবে গ্রহন করে। 
সেতু পার হয়ে ' বীরভূমের প্রবেশ দ্বার ' ইলামবাজার। পুরাতন বানিজ্য কেন্দ্র। নীল আর গালার পাইকারি ব্যবসা কেন্দ্র। Trade mart of importance " 
আরস্কাইন সাহেবের হাত ধরে এখানে গড়ে ওঠে 
নীল এবং গালার কুঠিবাড়ি ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য। বিরাট আকারে। 
ইলামবাজারে আছে তিনটি বিখ্যাত টেরাকোটা অলংকরণ শোভিত মন্দির। টেরাকোটা প্রেমী দের 
অবশ্য দ্রষ্টব্য। 
বোলপুরের রাস্তা ধরেছেন। সুখবাজার পার হয়ে শাল জঙ্গলের অপূর্ব বনপথ শুরু হল। এই জঙ্গলে র নাম চৌপাহাড়ি বা চৌপাহারি। কেন এমন নাম! 
শুনবেন। তো বেশ। হবে। না হয় 
জঙ্গল শুরু হবার মুখেই চমৎকার নৈসর্গিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে ইলামবাজার কবি জয়দেব মহাবিদ্যালয়। 
জঙ্গল পথের শেষে বনভিলা। সান্যাল বাবুর হাতে তৈরি বনলক্ষ্মী। আর এখন গড়ে উঠেছে অনেক 
লজ, রিসর্ট। চলে গেছে দক্ষিণে অজয়ের ধার পর্যন্ত। আবার দেউলী র দিকে। 
দেখেছেন দেউলী কে!  এখানে আছে পাল সেন যুগের পার্বতী মূর্তি। আছে বৈষ্ণব সাধক কবি লোচনদাসের স্মৃতিধন্য সাধন স্থল। 
বনভিলা পার হলেন রামনগরের দিঘীর পাশ দিয়ে 
কামারপাড়া। বড় রাস্তার গায়ে গড়ে উঠেছে বিরাট হোটেল। আর একপাশে আবাসনের হাই রাইজ। 
যেন শুরু হয়ে গেল বোলপুর শান্তিনিকেতন। 
কত আবাসন, লজ, স্কুল, দোকানপাট , পেশাগত শিক্ষার বিরাট প্রতিষ্ঠান। 
বাইপাস ধরে যাচ্ছেন। ঢুকলেন মাহিদাপুর হয়ে 
শ্রীনিকেতন। সুরুল। এই সুরুলের অনেক কথা। 
কালীসায়রের পাশ দিয়ে পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্রের পাশ দিয়ে, বিনয় ভবনের মাঠকে ডানদিকে রেখে 
শান্তিনিকেতন। 
শান্তিনিকেতনে র চারপাশে যে গড়ে উঠেছে কত 
থাকা খাওয়ার জায়গা। রিসর্ট, হোটেল ইত্যাদি। 
আছে সোনাঝুরির হাট। খোয়াই, আর কোপাই। 
শান্তিনিকেতনের আশ্রম এলাকার কথা বললাম না। 
যদি বলেন দ্বিতীয় পর্বে হবে। 
আমি এগারো মাইল থেকে শুরু করেছি। পানাগড় থেকে শুরু করলে ভালো হত। 
মেলা তো এবার জমজমাট। অনেক অনেক মানুষের ভিড়। অনেক দোকান পাতি। যেমন মেলা হয় আর কি। এবার মেলা যেন স্বমেজাজে। 

------------ ------------ ------------ ------------ ------------ 





Saturday, 21 December 2024

একই খিদে ঃ খিদের জ্বালা

।। একই খিদে ঃ একই জ্বালা।। ২ পর্ব। 

 মাটি। মা - টি ই। জননী মৃত্তিকা। হে মহা প্রকৃতি। 
 প্রতিদিন পুড়ে যায়। কত মাটি। ইঁট ভাঁটা গুলির দিকে তাকাবেন। মাটির পাহাড়। এত মাটি পুড়ে যাচ্ছে। পাহাড় প্রমান এত উর্বর মাটি আসে কোথা থেকে। উত্তর দেবার দায় কেউ নেবেনা। ভূমি সংস্কার দপ্তর আছে কিন্তু! 
 প্রতিটি ভাঁটা বা ইঁটখোলায় কি পরিমান  ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহৃত হয়। 
 কত বিদ্যুৎ পোড়ে। 
 হিসাব! হায় হিসাব। হিসাব নাই। তা নয়। এখানে বিনিময় প্রথা আছে। বুঝতেই পারছেন। 
 ও!  বললেন না যে কত মানুষের কর্ম সংস্থান হয়। 
 ঠিকই তো। পুরুলিয়া, সীমান্তের ঝাড়খণ্ড থেকে শ্রমিকরা আসে। কয়েক মাসের সংসার পাতা। কাঁচা ইঁটের ঝুপড়ি তে। চেহারায় শুষ্কতা। দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। না। ঘুচলনা এঁদের দারিদ্র্য। স্বাধীনতার এত গুলো বছর পরেও। 
 কথা হচ্ছে ইঁট ভাঁটা নিয়ে। লক্ষ্য করে দেখবেন যেখানে যত ভালো দোঁয়াশ মাটি সেখানে পাশাপাশি ইঁটের ভাঁটা। 
 কত মাটি প্রতিদিন পুড়ে যাচ্ছে। মাটির বিকল্প মাটি। 
 এর পূরণ হবেনা। এর সাথে পুড়ে মরে যাচ্ছে কত অনুজীব।কত ক্ষুদ্র প্রাণ। 
 সব ভাঁটাই চলে কয়লায়। কিছু কাঠ ও লাগে। কাঠ মানেই বৃক্ষছেদন। আর যে কয়লায় ভাঁটা চলে সে কয়লা বাহক দের দেখতে পাবেন, একদিন ভাঁটার সামনে দাঁড়ালে। 
 কি ভাবে যে অত ভার বয়, এক একটা মোটর সাইকেলে।  
 কয়েক কুইন্টাল কয়লা। নিশ্চয়ই বলে দিতে হবেনা এই কয়লা কালো। আরে কয়লা তো কালো ই। 
 কালো টাকার মতো এই কয়লা কালো। 
 আকাশ জুড়ে কালো ধোঁয়া। শীতকালে এই ইঁট তৈরী র মরশুমে এই গ্রামাঞ্চলেও  সন্ধ্যায় মারাত্মক ধোঁয়াশা। 
অজয় তীরের বনকাটি, বিদবিহার আর দামোদর তীরের সিলামপুর, আমলাজোড়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ইঁট ভাঁটার রমরমা। 
 আর ভাঁটার ট্রাকটর। ট্রিপ। মাটি ভর্তি ট্রাকটর ছুটছে যেন মার্সিডিজ। খুবই বিপজ্জনক ভাবে ছুটছে এই ভারী গাড়িগুলো । আর চালাচ্ছে সব কমবয়সী, সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গীয় ঘরের ছেলেরা। আপত্তির কিছু নাই। 
 এদের কিন্তু কোন ট্রেনিং নাই। লাইসেন্স নাই।  না থাক! 

 বুঝছেন না কেন ইঁট মানেই উন্নয়ন। কত বিশাল বিশাল 
 হাই রাইজ তৈরী হচ্ছে। ইঁট ছাড়া নগরায়ন সম্ভব! 
 ইঁট তো শরীর কোষের মতো। 
 মাটির ইঁট আর ছাই এর ইঁট এক হল! 
 না। এক নয়। 
 আমি দেখছি এক ভাবে। আপনি দেখছেন অন্য ভাবে। 
 দেখা তো আলাদা হবেই। 
 অথচ ভাবা যেত পারত। মাটি যে নাই তা নয়। যথেষ্ট মাটি আছে। নদীর মাঝে মাঝে যে চর জেগেছে - সেই চরের মাটিকে ব্যবহার করা যেতে পারত। নদীর স্রোতের বাধা দূর হত। দুপারেরই উপকার হত। 
 জলাধার গুলি তে ড্রেজিং করা যায়। মাটি তুলে তাকে ব্যবহার করার উপযুক্ত পরিকল্পনা করতে হবে। কে করবে। সরকার কেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকার অবশ্য তার অপারগতা প্রকাশ করেই আছেন। 
 অতএব ছাড়ুন তাঁদের হাতেই যাঁদের ক্ষমতা আছে। 
 যাঁরা রাতারাতি একটা গোটা পাহাড় কে হজম করে দিতে পারে। আরাবল্লীর, কত পাহাড়, টিলা চুরি হয়ে গেছে। 
 আমাদের পুরুলিয়া তে ও তাদের শ্যেন দৃষ্টি। 
 অনেক দামী পাথর, মূল্যবান খণিজ সম্পদে ভরপুর। 
  লাভ আর লোভের চোখ চকচক করছে। 
 ------------ ------------ ------------ ------------ ----------- ২ য় পাতা শেষ।

Thursday, 19 December 2024

।।একই খিদে। খিদের জ্বালা।।

।।।। কি খাদ্যাভাব  এদের ।। 
 এরাও জীব। এদের ও খিদে আছে। খাদ্য নেই। 
 না খেয়ে মরে যাওয়াই কি ভবিতব্য! 
 এরা কি ভবিতব্য বোঝে! 
 কোন বোধ কাজ করে হয়তো। 
 লোকালয়ে চলে আসছে। সন্ধ্যা হতেই কাতর চিৎকার। 
 সারা দিনে পেটে কিছু পড়েনি। 
 সহজে মানুষের মতো বিপজ্জনক প্রাণী র কাছে এরা আসেনা। একেবারে নিরুপায় না হলে। 
 জানে মানুষ সবচেয়ে উঁচু প্রাণী। 
 যদি কিছু করে কেউ! না খেয়ে মরে যাবার আগে শেষ মরিয়া চেষ্টা। 
 আজ ঘরের পিছনে পুকুর পাড়ে কাতর চিৎকার। 
 সন্ধ্যা একটু ঘনিয়েছে মাত্র। 
 খাবারের খোঁজে মানুষের দুয়ারে আসছে। 
 এদের কথা ভেবেই বুঝি কোন কোন মন্দিরে ' শিবা ভোগের ' কথা ভাবা হয়েছিল। 
 এখনও কোন কোন মন্দিরে সেই রীতি চালু আছে। 
 খিচুড়ি ভোগ যথারীতি তারা খেয়ে যায়। 
 এই কয়েক বছরে তাদের সংখ্যা বেড়েছে। 
 একেবারে প্রায় শেষ হয়েই যাচ্ছিল। 
 গম্ভীর টার্ম আছে বই এর পাতা তেও। 
 যেমন শকুন হারিয়েই গেছে। 
 আরও কত জীব। 
 হাতির পাল নেমে আসছে। পাহাড়তলী তে। ধান খাবার জন্যে। পাহাড়ে কোন খাবার নাই। মানুষ তাড়াচ্ছে। মানুষের ও উপায় নাই। তার পেটের ভাতের জোগাড় শেষ করে দিচ্ছে যে। 
 বানর গুলো র কি উৎপাত! অসহ্য। সংখ্যায় যথেষ্ট বেড়েছে। প্রকৃতি কেন যে নিয়ন্ত্রণ করছেনা। 
 এত উৎপাতের কারণ তো সেই খিদের জ্বালা। 
 সহ্য করতে পারছেনা। ক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গলে কোন, খাওয়া যায়, এমন গাছের পাতা নাই, ফুল নাই, ফল নাই। 
 তা না হলে আকন্দের পাতা খায়। 
  মানুষের মাঠে সব্জি নাই। মাঠের পর মাঠ পড়ে আছে। কোন সব্জি চাষ নেই। শুধু ধান। আর কিছু আলু। 
 গ্রাম আছে। থাকবে। কিন্তু সেই গ্রাম নয়। গ্রামের চারপাশের দোমাঠের  শস্য, সব্জি ভরা সেই ক্ষেত শুধু ছবি হয়ে যাবে। 
 চাষ করবে কে! চাষ করার লোক নাই। চাষির ঘরের ছেলেরা চাষ জানেও না। চায়ও না চাষ করতে। 
 আর চাষের খরচ যা বেড়েছে, সব জমি চলে যাবে শেষ পর্যন্ত কর্পোরেট এর হাতে। সেই পরিকল্পনা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকেই। 
 প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও সম্পর্কিত। অনেক কথা বলা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক অনেক কথা থেকে যাচ্ছে। 
  চড়ুই, মৌমাছি, প্রজাপতি, জোনাকি সব হারাবার পথে। 
 দায় তো আমাদের। আমাদের সভ্যতার। কিন্তু দায় স্বীকার তো করবনা। 
 এতো পাপ। শেষ হয়ে গেল মাটি। নিজেরাই শেষ করে দিলাম। 
 ------------ ------------ ------------ ------------ ---------১ ম পর্ব 
আরও কয়েকটি পর্ব নিয়ে এক বড় প্রবন্ধ হবে। 
এখানে দেব কি না জানাবেন। ভালো না লাগলে দেবনা। 
আমি মাত্র একটি ছোট্ট এলাকা কে মডিউল ধরে কথা বলছি। একই অভিজ্ঞতা সবার না হওয়াই স্বাভাবিক। 
 পশ্চিম বর্ধমান এর কাঁকসা থানার অযোধ্যা - বনকাটি এলাকা। ৭১৩১৪৮।

ছবি। পাকা ফসলের ক্ষেত। শিল্পী । ভ্যান গগের।