Tuesday, 26 June 2018

জঙ্গলমহলের শিবপূজা

পরপৃষ্ঠা রক্ষিত পুরের শিবের গাজন কথিত আছে সে প্রায় চারশো বছর আগে স্ব্ররূপ ঘোষ নামে এক ব্যক্তির গাই গোরু টি বাড়িতে দুধ দিতনা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সে দুধ দেয় একটি পাথরের মাথায়। স্বপ্নাদেশ পেলেন যে কাশী বিশ্বনাথের ই অংশ ইনি।তাঁকে প্রতিষ্ঠা র এবং পূজার্চনার আদেশ পেলেন। গ্রামের মানুষের সহযোগিতা য় মাটির ঘরে তাঁ্র প্রতিষ্ঠা হল। লোহাগুড়ি গ্রামের জগবন্ধু সরকার মশাই স্বপ্নাদেশ পেয়ে অতি চমৎকার আধুনিক মন্দির বানিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি ছয় সাত টি গ্রামের মানুষ এই শিবের গাজনে সাহায্য সহযোগিতা করেন। কুড়ি- পঁচিশ টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ উৎসব এ অংশ গ্রহন করেন। এখানে চরক কাঠ টি ২০-২৫ ফুট উঁচু। দড়ি বেয়ে উঠে ভক্তারা পাক খান। চরক কাঠ টি যে পুকুরে রাখা হয় সেখান থেকে সেটিকে আর পাওয়া যায়না। কলকাতার দলের যাত্রাপালা সহ গান বাজনার অনুষ্ঠান হয়। শ্রী গুরুপদ রায় এবং শ্রী তারাচরন রায় এই শিবের পুজার্চনা সহ গাজন অনুষ্ঠান টি পরিচালনা করেন। বাঙ্গালী র মূল কিন্তু তন্ত্রে। তাই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম পাল রাজাদের রাজত্ব কালে বাঙ্গলায় যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল।এই কদিনে শিব সবার। সকলের অধিকার।সমাজ বিন্যাসের নীচের তলার মানুষ গুলি কে আবার কাছে নেওয়া হল। এঁরা ই তো সব জাতপাত হীন বৌদ্ধধর্ম এ যোগ দিয়েছিলেন। পাল পর্বের পর বা এঁরা আবার ফিরতে বাধ্য হলেন। স্ব গোত্র ছেড়ে শিব গোত্রে নাম লেখালেন।আর শিব তো এক অসাধারণ দেবতা।তিনি সবার ই হতে পারেন।প্রাচীন ধর্ম ; ধর্মরাজ ; বুদ্ধ; শিব সবাই এই বাঙ্গলায় মিশে গেছেন। সামাজিক প্রয়োজনেই এই মিলন মিশ্রণ। আর বাঙ্গালীর সাধনা তো মিলন মিশ্রনের ই। এই আমাদের ঐতিহ্য। -----------------------------------------------

জঙ্গলমহলের শিব পূজা

শিব ঠাকুরের গাজন -------------------প্রণব ভট্টাচার্য কাছে দূরে ঢাক বাজছে। শিবমন্দির প্রাঙ্গণে। গাজন আসতে আর দেরী নাই। আমাদের এই রাঢ় বাঙলার নানা গ্রামে চৈত্র সংক্রান্তি র শিবের গাজন একটি বৈশিষ্ট্য পূর্ণ লোকায়ত উৎসব। আমাদের এই এলাকার অর্থাৎ থানা - কাঁকসা ; প: বর্ধমান জেলার অন্তর্গত বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এবং সংলগ্ন একটি গ্রামের গাজন উৎসব নিয়ে একটু আলোচনা করব। তার আগে সংক্ষেপে একটু ইতিহাস বলে নিই। হয়তো জানেন ; আউশগ্রাম এবং কাঁকসা থানা এলাকার জংগল ভূমি নিয়েই বর্ধমানের জংগল মহল। প্রাচীন গোপভূম। পরগণা - সেনপাহাড়ী। এখানে ই বিখ্যাত ' গড় - জংগল '। এই সেই ধর্ম্মমঙ্গল খ্যাত ইছাই ঘোষের প্রাচীন রাজত্বভূমি। জংগলের মধ্যে ছিল গড়। মোটামুটি হাজার বছর আগের কথা। গড় নাই। ধংসাবশেষ আছে।আছেন গড়ের দেবী শ্যামারূপা। আর আছে ইছাই এর স্মৃতি জড়িত স্থানে অবস্থিত বিখ্যাত পুরাকীর্তি ' ইছাই ঘোষের দেউল'। সীমান্ত এলাকা। উত্তরে অজয়।ওপারে বীরভূম। জয়দেব - কেন্দুলি। গঞ্জ - ইলামবাজার। তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান বীরভূম। বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ১৬ টি মৌজা। ২২-২৩ টি গ্রাম। লোক সংখ্যা আনু-২০-২১ হাজার। মোট শিবমন্দির ৩০ টি। ভগ্ন সমেত। বসুধা প্রাচীন গ্রাম।বেশ কয়েকটি শিব মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে।এখন রয়েছে একটি বেশ বড় সহ তিনটি ছোট মন্দির। রঘুনাথপুর গ্রামে রয়েছে টি মন্দির। অযোধ্যা- বনকাটি এই এলাকার কেন্দ্রভূমি।পুরোনো দিনের গঞ্জ। সমৃদ্ধ গ্রাম। এখানেই রয়েছে ১৯-২০ টি শিবমন্দির। সব ই পারিবারিক। দু টি ছাড়া।এই দুটি ই গ্রাম্য সর্বসাধারণ এর। বনকাটির রায়বাড়ির বিখ্যাত কালীমন্দির প্রাঙ্গণে নির্মিত হয়েছিল সর্বপ্রাচীন শিবমন্দির টি।১৭০৪ শকাব্দে। টেরাকোটা র কাজের জন্য বিখ্যাত গোপালেশ্বর শিব মন্দির টি১৭৫৪ শকাব্দে নির্মিত। ভূগর্ভ থেকে উত্থিত অযোধ্যা গ্রামের অনাদিনাথ শিবলিঙ্গ সহ মন্দির টি ও সু প্রাচীন। এটি সর্বসাধারণ এর। এই শিব কে কেন্দ্রকরেই শিবের গাজনের ধূম।যে ধূম ছিল তা আজ আর নেই। মানুষের সেই উৎসাহ নেই। বহু স্তরীয় নানা জটিলতা। নানা বিভাজন। যাই হোক তবু হয়। একটু দুরেই সংলগ্ন মলানদিঘী গ্রাম পঞ্চায়েতের রক্ষিত পুর প্রাচীন গ্রাম। ইছাই ঘোষের আমলের গ্রাম। ধন দৌলত এখানে সম্ভবত রক্ষিত থাকত। এখানের শিবের গাজন খুব ই বিখ্যাত। শুরুতে অযোধ্যা গ্রামের অনাদি নাথ শিবের গাজনের কথা।একটু বলি এই শিবলিঙ্গ টির সারা বছর পূজার্চনা এবং হোম যজ্ঞ চরক গাজন এর জন্য বর্ধমান এর রাজা রা ২৮ বিঘা জমি দান করেছিলেন। বামুন পাড়ায় পুরোহিত এবং তত্বাবধানের জন্য বাগদী পাড়ায় গাজনের ভক্তা মুচি পাড়ার ঢাকি - সবার জন্য ই কিছু জমি বরাদ্দ হয়েছিল। অতীতে এখানকার গাজন ছিল খুব ই বিখ্যাত।মন্দির প্রাঙ্গন পথ ঘাট একে বারে লোকে লোকারণ্যহয়ে যেত। গাজনের ভক্তাদের নাচ। বাণ ফোঁড়া অবস্থায়। সারা অঙ্গে ই বাণ ফোড়াঁ।অষ্ট অঙ্গে। হ্যাঁ বান ফোঁড়ার জন্য ; বাণ তৈরি র জন্য কামার দের দায়িত্ব নির্দিষ্ট ছিল।তার জন্য তাঁদেরও জমি ছিল। দুটি গোরুগাড়িকে জুড়ে তৈরি করা হত গাজনের ভক্তাদের গাড়ি। সামনে পিছনে মোটা কাঠের খুঁটি মাস্তুল এর মতো শক্ত করে বাঁধা। দুই খুঁটিতে বাঁধা আনুভূমিক লম্বা বাঁশ বা কাঠ। তাতে ঝুলছে ভক্তা রা। দোল খাচ্ছে।ফুল ছূড়ছে।পা উপরে মাথা নীচে। খুব সহজ নয়। তিন দিন চলছে উপোষ। সন্ধ্যায়সামান্য ফলজলে আর কি হয়। যাকে বলা হয় ছোট বানামো - সেদিন থেকেই শুরু।অশৌচ পালনের মতো কোড়াাকাপড় এর বস্ত্রখণ্ড পরিধান।গলায় সেই কাপড়ের গলবস্ত্র। লোহার এক চাবি তাতে বাঁধা। কার মৃত্যু জনিত শোক পালনের নিদর্শন? গ্রামে গ্রামে চলে পরিক্রমা। মাথায় মনুষ্য আকৃতি র একটি মোটা কাঠের প্রতীকী এক বস্তু। গায়ে তার অনেক কাঁটা পেরেক বা মোটা জলুই গাঁথা। এ কার মৃত দেহের প্রতীকী রূপ। গ্রাম পরিক্রমা ; গৃহস্থ মানুষজনের কাছ থেকে চাল ডাল আনাজ পাতি সংগ্রহ। মুখে জয় বাবা বাণেশ্বর - আওয়াজ। জয় বাবা ধর্মরাজ। কে এই বাণ। পুরাণ এর সেই শিবভক্ত বাণ রাজা। যাঁর নামে বাণ লিঙ্গ? দ্বিতীয় দিন বড় বানামো। নির্জলা উপোষ সারাদিন। সন্ধ্যায় একটু ফলজল। আবার সেই গ্রাম পরিক্রমা। বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে পরিক্রমণ। ক্লান্ত শরীর। তৃতীয় দিন চরক। কোথাও নাগরদোলা র মতো চরকের চরকি। চতুর্থদিন হোম ; যজ্ঞ। বিকালে নিমপাতা বাটা মেশানো বেলের সরবত।ভক্তা দের জন্য। রাত্রে ভোগ প্রসাদ। গাজনের অনুষ্ঠান শেষ। ভক্তাদের পালন শেষ। ------( পরের পাতায়) --

বীরপূজা ২

পরপৃষ্ঠা------- বীরপূজা আমরা আলাদা। আমরা বাগ; ব্যগ্রক্ষত্রিয় - বাগদী। আমরা অনেক যুদ্ধ করেছি। হয়েছিলাম রাজা। বাগদী রাজা। বিষ্ণুপুরের রাজারা আমাদের ই লোক। আমাদের জাত আলাদা। আমরা উঁচু। আমরা সেন পাহারীর মুচি। আমাদের নাম শুনলে ভয়ে জান কতজনার শুকিয়ে যেত। বলে কয়ে ডাকাতি করতাম। ছিল আমাদের বাহিনী।। আলাদা দাম ছিল তার। বিশেষ ডাক ছাড়া আমরা বেরুতাম না। আমাদের আলাদা এলেম ছিল। আমরাও তাই। আমরা হাঁড়ি।আমরাই তো সর্দার। আমাদের চেয়ে ওস্তাদ আর কে? আমরা ডোম। পাঁচ টা থাক আছে আমাদের।আলাদা দাম পেয়েছিলামআমরা সেই কবে হাজার বছর আগে। আমরাই আগে যোগ দিয়েছিলাম বৌদ্ধ ধর্মে। আমরাই হয়েছিলাম পুরোহিত। হাতে ছিল তামার বালা। আমাদের মেয়েদের ছাড়া তন্ত্র সাধনা হয়েছে না কি। সে ছিল আমাদের এক আশ্চর্য দিন। আমাদের ছাড়া যুদ্ধ করে কার সাধ্যি। আগে আমি; বাগে আমি। আগে ডোম বাগে ডোম ঘোড়াডোম সাজে। আঁকুড়ে ডোম। যূদ্ধ ই আমাদের পেশা। আমাদের চেয়ে বড় যোদ্ধা আর কারা ছিল। হ্যাঁ বাইরেও যেতাম। তেমন ডাক পেলে। খাতির চাই। সে যুদ্ধ করতে ত্রিপুরা রাজাদের ডাকে গিয়েছি। আবার বড় বড় দিঘী কাটতে ও বছরের পর বছর সেখানে থেকেছি। রাজত্ব আগলেছি। আমরা কালু ডোমের বংশধর। সেই বীর কালু। আপনারা জানেন ধর্ম্মমংগল কাব্যে আছেন।সে সহায় না হলে কি লাউসেন পারত ইছাই ঘোষ কে হারাতে। কি শেষ করতে। লাউসেন এই এলাকার বন জংগল ; পথঘাট কিবা জানত। আমি লোকজন নিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। ঐ অজি মানে অজয় নদী কে চেনা সহজ ব্যাপার নয়। বড় বড় নৌকো চলে। জল গভীর। জলে ঘূর্ণি। প্রবল টান। তো লাউসেন নদী র এপারে মানে উত্তরে আমাদের গাঁ য়ের কাছেই তাঁর শিবির পাতলেন। জয়দেব কেন্দুলী র কাছেই আমাদের গাঁ। সুগড়। পরে রাজারা গড় বানিয়েছিলেন। তো ভীষণ যুদ্ধ হল। কত সৈন্য যে মারা গেল। রক্তগঙ্গা বইল। ' রক্তনালা' দিয়ে সে রক্ত গড়িয়ে গেল। নদী পেরিয়ে যারা গিয়েছিল তারা আর কেউ ফেরেনি। ঐ' কাঁদুনে ডাঙ্গা' তেই সব শেষ। গড় পর্যন্ত আর কাউকে পৌঁছতে হয়নি। ইছাই এর গড়। সে দারুন শক্ত পোক্ত গড়। মোটা মোটা পরপর মাটির ; ইঁটের তিনটে পাঁচির। ভেতরে ঢুকি সাধ্য কার। ভিতরে ' ঢেকুর গড়'। কামারদের তৈরী। ঐ ঢোকরা কামার। যেমন ধারালো তাদের অস্ত্র। লোহাগুড়ি তে তাদের প্রধান আস্তানা। ইছাই এর গড় ভেদ করা সোজা নয়। তারপর ইছাই তন্ত্রবলে বলীয়ান। তাঁর আরাধ্যা দেবী' শ্যামারূপা'। তাঁর বর আছে। -------------- পরপৃষ্ঠায়

বীর পূজা

বীরপূজা ----------------------- প্রণব ভট্টাচার্য সমাজ বিন্যাসের নীচুতলার মানুষেরা বা তথাকথিত নিম্নবর্গীয় মানুষজন নিজেদের আত্মপরিচয় এর শিকড়ে যেন ফিরতে চাইছেন। নীচু বলে নিজেদের ভাবতে কার ভালো লাগে। অথচ এ দেশে জাতপাত তো খুব ভারী পাথর। খুব সহজে যে সে পাথর টাকে সরানো যাবেনা। তাও খুব না জানা নয়। সবাই বুঝি যে এ এক বিরাট ব্যবসা। বিরাট রাজ নীতি র খেলা আছে এখানে। অথচ কেউ মসিহা নয়।তবু- - এই সব মানুষ দের ঘর থেকে উঠে গেছে যে সব যুবকেরা - যারা শিক্ষিত হয়েছে। ডাক্তার ; বিদ্যালয় ; মহাবিদ্যালয় এর শিক্ষক হয়েছে। তাদের কারোর ই নিজেদের জাত পরিচয় দিতে ভালো ও লাগেনা। নিজেদের পদবী গুলোকে ব্যবহার করতে ও ভালো লাগেনা। না -। লাগেনা। কিন্তু কতটা আর পদবী র বানান বদলানো যায়। কার ভালো লাগবে জানিনা লিখতে পদবী- অসুর; বাগদী ; হাঁড়ি ; ডোম ; চণ্ডাল ; বাউরী ; মুচি; মাল এই সব পদবী লিখতে সত্যি ভালো লাগেনা। এমনকি আদিবাসী সাঁও তাল কোন ডাক্তারের পদবী মূর্মূ কি মাড্ডি লিখতে আর ভালো লাগেনা। 'আমি আদিবাসী সাঁওতাল ডাক্তার কি শিক্ষক - আমার নিজের মনেই প্রশ্ন কি জানি আমাকে কতটা কি মানবে ' - মধ্যবিত্ত শিক্ষিত উচ্চস্তরীয় সমাজ। অথচ উপায় ই বা কি। এখানেই আসে আত্মশ্লাঘা ; গর্ব অনুভবের একটা প্রয়াসপ্রচেষ্টা। লাগে নিজেদের সমাজের একজন বীর। এক icon। অনেক লড়াই ই তো হয়েছে। আছে বীর আছে। আমরা ও ক্ষত্রিয়।কেউ ব্যগ্রক্ষত্রিয়। কেউ বীরবংশী। কেউ বলছি রায়। কেউ বলছি বাউরী নয় ক্ষত্রিয়। মুনি র ছেলে।বাহক মুনি। আমরা ক্ষেত্রপাল।রাঢ়মণ্ডলের রাজা ছিলাম। আরে বাবা শিবের বিয়েতে পাল্কী বইছিলাম।একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিলাম। মদ্যপান ছাড়া একাজ করা যায় নাকি। তাছাড়া বিয়েবাড়ি বলে কথা। তাছাড়া শিবের বিয়ে। তো নেশার ঘোরে ভুলভাল করে কিছুটা ফেলেছি। গেলাম অধঃ পতিত হয়ে। ------------- পরপৃষ্ঠা য়----

প্রাচীণ সেই বনকাটি

প্রাচীন সেই বনকাটি ------------- প্রণব ভট্টাচার্য ১৭০৪ শকাব্দ। মানে ১৭০৪+৭৮ = ১৭৮২ সাল। মানে আজ থেকে ২৩৫-৩৬ বছর আগে এখানকার মানে এই এলাকার প্রথম শিবমন্দির টি তৈরি হচ্ছে বনকাটি গ্রামে : থানা - কাঁকসা প: বর্ধমান। বিখ্যাত রায় বাড়ির কালীবাড়ি র প্রাঙ্গণে। পাশাপাশি দুটি চারচালা মন্দির। হয়তো ছোট। টেরাকোটা র কাজের বিস্তৃত অলংকরণ নাই। উত্তর মুখী। শিবলিঙ্গ ও তাই। দিক নির্দেশক ও বটে। এরপর ৫২ বছর পর নির্মিত হচ্ছে একই প্রাঙ্গণে পূর্বমুখী তিনটি বেশ বড়ো পীড়যুক্ত শিবমন্দির। স্বল্প টেরাকোটা র কাজ। কিন্তু ভালো। মন্দিরের পিছন দিক সাধারণত অলংকৃত হয়না। কিন্তু এখানে পঙ্খএর প্লাস্টার এর উপর চমৎকার লতাপাতার ফ্রেস্কোর কাজ। রংতুলি তে আঁকা। কি ডিজাইন! আহা! প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। যেটুকু বোঝা যায়- - এখানে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে মিস্ত্রী কারা। তাদের নাম জানার কোন উপায় নেই। ডিজাইনে মিল থাকেই। এই এলাকার অন্যান্য কয়েকটি মন্দির এরকাজের সাথে মিল আছে। মনে হয় মিস্ত্রী একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। ঘরানার মিল। অর্থনৈতিক অবস্থা র উন্নতি ঘটল। সেই সময় টাকে ঠিক ঠাক বুঝতে চাইছি- সামগ্রিক ভাবে।

এপার- ওপার

দ্বিতীয় পাতা ---+------ আহা সত্যম্বর অপেরা। কে না এখানে এসেছেন। এত পুরোনো আসর।এখানেএকটা অন্য রকমের পরিবেশে গান শুনতে বেশ লাগে। ডাঙ্গাল গ্রামের ঘোষ বাবুরা সব দিক তদারকি করেন। সংগে অবশ্য ই বসুধা র মানুষেরা। প্রতিদিনের এপার- ওপার। এমন লোক ও এপারে আছে - যাঁদের একদিন না গেলেই চলবেনা। মানে ঐ যাকে বলে না পেটের ভাত হজম হবেনা। গোরু ছাগল কেনা বেচার হাট বসে শণিবারে সুখবাজারে।এপার থেকে অনেক মানুষ যায়। সত্যি কথা কি যে এপারের মানুষ জন না গেলে ওপারের বাজার হাট তেমন জমেনা।এপারের আদুরিয়া - অমরপুর ;মাজুরিয়া - রঘুনাথপুর ; চুয়া- রক্ষিতপুর ; অযোধ্যা- বনকাটি এতো বড় এলাকা থেকে কম মানুষ তো যায় না। আর ডাঙ্গাল- বসুধা ; অযোধ্যা- বনকাটি র মানুষের তো এক পা এপারে তো আর এক পা ওপারে। আর কালিকাপুর- মৌখিরার বাবুদের তো কাছারি বাড়ি রয়েছে। ইলামবাজারে তাঁদের অনেক সম্পত্তি। হাট বসে তাঁদের ই জায়গায়। তোলা আদায় হয়। কাছারি বাড়ী র দক্ষিণে পুকুর। দক্ষিণ পাড়ে তার তখনকার দিনের এম; ই স্কুল। প্রাইমারি স্কুল। এপার থেকেও ছেলেরা যায়। কেউ কেউ ওখানে থেকে পড়াশুনো করে। বসুধা র সব্জী ; না গেলে তো হাটে যেন কি নাই কি নাই ভাব। অবশ্য সে সব সব্জী গাড়ী বোলপুরপর্যন্ত গড়িয়ে যায়। ধান চালের গাড়িও যায়। এপারে কালিকাপুর- মৌখিরা য় বাবু দের দুর্গাপূজা দেখতে ওপারের অনেকে আসেন।তোপ দাগা হয়। নারকেল কাড়াকাড়ি খেলায় মস্ত ভিড়।ঠেলাঠেলি থেকে মারামারি নিয়মিত ঘটনা। তবু মানুষ যাবেই। আসবেই। গড়জঙ্গলে দেবী শ্যামারূপা র পূজা দেখতেও অনেকে সাইকেল নিয়ে যান। তখন গ্রামেগ্রামে শখের যাত্রাদল। ইলামবাজারের চাতোর পাড়ার যাত্রা দলেরবেশ সুনাম। স্থানীয় অভিনেতা সব। কিন্তু অভিনয় ক্ষমতা ভাল। তখনি অমর ব্যানার্জী ;দত্ত বাবু রা অভিনেতা হিসাবে ভাল নাম করেছেন।বিশাল চেহারা নিয়ে অমর দা র স্টেজ অ্যাপিয়ারেন্স ছিল দেখবার মতো। তেমনি ভরাট কণ্ঠস্বর। পেশাদার দলে গেলে খুব ই নাম করতেন। কিন্তু যান নি। এপার থেকে অনেকে যেতেন ওঁদের যাত্রা দেখতে।অযোধ্যা- বনকাটির যাত্রা দলের ও বেশ নাম ডাক। গ্রামীণ পেশাদার দলের মতো। আশেপাশের নানা গ্রামে তাদের বায়না হতো। নিজেদের সাজ পোষাক সব ই ছিল। এঁদের যাত্রা দেখতে ওঁরাও আসতেন। পরস্পর কে নিমন্ত্রণ ও করতেন তাঁরা। মানুষের দীর্ঘদিন এর আশা অজয় সেতুর কাজচলছে পুরোদমে। বিশাল কর্মযজ্ঞ। আদতে ডাঙ্গাল গ্রামের ঘোষ বাবুরা নানা মাল সরবরাহ করছেন ' চন্দ্র কোম্পানি ' কে।ঐ কোম্পানি ই সেতু তৈরি করছেন। গঁড়াই দের মুদিখানায় শ্রমিক দের ভিড় লেগেই আছে।আরো অনেকে নানা ভাবে ব্যবসা করে বেশ ধনী হয়ে উঠলেন। খুব শীঘ্র সেতু র উদ্বোধনহবে। মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিধান চন্দ্র রায় আসবেন।দিন রাত এক করে কাজ চলছে। যাতায়াত সহজ হবে। মানুষের মনে খুব আনন্দ। দুপারের সম্পর্ক আর ও সহজ ; সুন্দর ; ঘনিষ্ঠ হবে।

এপার - ওপার

ওপারের সাথে এপারের সম্পর্ক বরাবরই নিকটে র। মাঝে নদীটা অবশ্য বর্ষা য় ভোগায়। কি আর করা যাবে ।খয়েরবুনি শিমুল তলার ঘাটে অবশ্য পারাপার এর নৌকো থাকে। আর জল কমেগেলে শীতের সময়ে এপার থেকে অনেকটা ; বালি ; পাথর ; মোরাম মাটি ফেলে উঁচু রাস্তা আর জলের উপরেকাঠ বাঁশের সাঁকো। বাকী জল্টুকু মোটা মোটা পাইপের উপর অস্থায়ী বালির বস্তা ফেলে আর পাশে বাঁশের গার্ড ওয়াল - পারাপারের চমৎকার রাস্তা।আর কি চাই। ইলামবাজার যেতে তো হবেই। গঞ্জ। বাজারহাট।বেচা কেনা। ধান চাল ; মুদিখানা; সোনারূপো ; ডাক্তার খানা ; হাসপাতাল; যন্ত্রপাতি মেরামতি ; শুকবাজারের তাঁতিদের বোনা গামছা কাপড় চোপড় ; ধামা কুলো সব হাটে পাওয়া যায়।ভাল সাইকেল মেরামতি র দোকান কানাই দার। কানাই দত্ত। মজাদার মানুষ। তাঁর দোকানেই আছে তিনকড়ি মিস্ত্রী। তাঁর মতো মিস্ত্রী এ তল্লাটে আর কেউ নেই। মেয়ের বিয়ের গয়না- সে হয় সাহাবাবুদের দোকান নয় হাজি সাহেব দের দোকান। তা ছাড়া আর কোথা। সাহা বাবুরা সিনেমা হল বানিয়েছেন। সামনে পুকুর পাড়ে গোরুগাড়ির ভিড় লেগে যায়।আশপাশের গ্রাম থেকে সব মেয়ে বৌ রা আসে। চব্বিশ প্রহরের মেলার খুব ধুম। কীর্তন গানের ভালো আসর বসে।এপার থেকে দলে দলে মানুষ যায় গান শুনতে। ভাল গান হলে এপারে অযোধ্যা র আসরের বায়না হবে।ইলামবাজারের একদল মানুষ এপারে র আসরে আসেন গান শুনতে। রূপাইচণ্ডী তলার কলকাতা দলের যাত্রা শুনতে ওপারের অনেক মানুষ আসেন। নানা ভাবে নানা বাহনে।এখানের যাত্রা গান না শুনলে চলে।