Friday, 6 November 2020

কুঠি বাড়ি ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য। চীপ সাহেবের কুঠি বাড়িতে আর সুরুল সরকার জমিদার বাড়িতে

।। কুঠি বাড়ি কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য।।      পর্ব - ১০
----------------    --------------------      ----------
  দুর্গা পুজো বলে কথা।
  ব্যাপার সামান্য নয়। কত শত আয়োজন। তা হোক
  কুঠি বাড়িতে তো কম নয় স্থানীয় কর্মচারী।
সবাই চাইছে। চীপ সাহেব ও ফেলতে পারলেননা।।
সবার অনুরোধ।
ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। মন্দা মানেই নানা আশংকা।
দুর্গাপুজো হোক। যদি পুজোয় সন্তুষ্ট হয়ে মা মন্দা কাটিয়ে দেন।
আয়োজন হল চীপ সাহেবের কুঠি বাড়িতে দুর্গাপূজা র।
আয়োজনের কোন ঘাটতি নেই।
সাড়ম্বরেই পুজা অনুষ্ঠিত হল।
খরচ হল মোট ১৭ টাকা।
সময়টা আঠারো শতকের শেষদিক।
সতেরো টাকা মানে খুব কম নয়।
টাকায় দু মন চাল পাওয়া যেত সে সময়।
আর নীল চাষে লাভ। ৩ টাকা বিনিয়োগ করে ১০ টাকা আয়।
বীরভূমের অন্যতম প্রাচীন পুজো বলা যেতে পারে।
এ তো গেল কুঠিবাড়ি র পুজো।
এবার যাই সুরুলের সরকার বাড়ির পুজোয়।
যে বাড়ির ঐতিহ্যপূর্ণ পুজো দেখতে হাজার হাজার
  মানুষ আসেন। জমিদার বাড়ির পুজো বলে কথা।
গুরুদেব বাসুদেব ভট্টাচার্য মহাশয়ের নির্দেশে
ভারতচন্দ্র সুরুলে এসে পাকাপাকিভাবে বসতি
স্থাপন করেছেন। আসার পর থেকে একটু থিতু হয়েই
শুরু করেছেন কাপড়ের ব্যবসা। ধীরে ধীরে জমে উঠেছে ব্যবসা।  তাঁর ছেলে কৃষ্ণহরি সরকার। তাঁর অনুমতি নিয়েই
সরকার বাড়িতে শুরু হল দুর্গাপূজা।
তখন মাটির ঘর।  সেই সময়কাল অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। পরবর্তী সময়ে এই বংশের সর্বাপেক্ষা সফল
ব্যবসায়ী  শ্রীনিবাস সরকার মশাই নির্মান করেন পাকা দুর্গাদালান। প্রাথমিক খরচ ১৮০০০ টাকা বেড়ে দাঁড়ায়
প্রায় দুই লক্ষ টাকায়। জমিদার বাড়ি তৈরী হল।
বিরাট সে প্রাসাদ। গোবিন্দ নামে মিস্ত্রী নির্মান করলেন।
আসল বেলজিয়াম গ্লাসের ঝাড়বাতি এল। যা এখনও ঝোলানো হয়। দেবী মূর্তির নানা আয়ূধ ; অলংকারাদি
এখনও প্রতিমাকে পরানো হয়। সবই সেই কালের।
একটি ট্রাস্টি বডি তৈরী হয়েছিল অনেক আগেই।
সেই ট্রাস্টি বডির মাধ্যমেই পূজা অনুষ্ঠিত হয় আজও।
মৌখিরা - কালিকাপুরএর জমিদার বাড়ির সাথে বৈবাহিক
সম্পর্ক ছিল সরকার বাড়ির। আমি মৌখিরার ' বুড়ো বাবু ' --
আমরা দাদা বলতাম। দাদা বৌদি খুব ভালো মানুষ। অনেক কথা তাঁদের কাছ থেকে শুনেছি। ভাল নাম তাঁর স্মরজিৎ রায়। বিশ্বভারতী র প্রথম যুগের ছাত্র শিবদাস বাবু তাঁর বাবা।
শিবদাস বাবুর কথা বলছি। তার আগে বলে নিই এই
মৌখিরা র রায় পরিবারের মেয়ে রাখালদাসী ছিলেন সরকার বাড়ির বৌ। একা এই মহিলা সিউড়ী যাতায়াত করে ডি;এম
সাহেব কে মাঝে রেখে এই ট্রাষ্টি বডি তৈরী করেছিলেন।
কতখানি দূরদৃষ্টি। আজও তাই পূজা চলছে।
এই শিবদাস বাবুর মাধ্যমে ই শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন এর অনেক জায়গা জমি সরকার বাবুদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে
পাওয়া গিয়েছিল।
ব্রাহ্ম বলে নাকি ঠাকুর দের জমি দিতে রাজী ছিলনা সরকার বাড়ি।  আরও কত কথা হয়তো জানতে পারতাম। কিন্তু
আকস্মিক ভাবে ই ' বুড়ো দা ' মারা গেলেন।
  আগের  দু টি পর্বে ই বলেছি এই সরকার বাবুদের কথা।
শ্রী নিবাস সরকার ই এই বংশের সর্বাপেক্ষা সফল ব্যবসায়ী।
এবং বিপুল অর্থ তিনি রোজগার করেছিলেন।
  মাতৃ শ্রাদ্ধে যিনি লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে পারেন।
জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আসেন হাতির পিঠে চেপে। আর চীপ সাহেব তো আছেনই। পরামর্শ দাতা। নানা ভাবে সাহায্যকারী।
  পরিবারের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন।
  এই সরকার পরিবার অন্যান্য অনেক ধনী পরিবারের মতো
জমিদারি কিনেছিলেন। মনোহরশাহী পরগনায় ; বারবাক সিংহ পরগনায় ; চম্পানগরী পরগনা সহ অন্যান্য জায়গায়।
' কুখ্যাত সূর্যাস্ত আইনে ' খাজনার টাকা মেটাতে না পারলে ই
জমিদারি গেল। আর নূতন ধনী ; রাজকর্মচারী রা কিনলেন।
জমিদার হয়ে গেলেন।
১৭৯৩ সালের ' চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ' আইনের কথা আমরা জানি। বেশী বলার দরকার ও নেই।
১৭৯৫ সালেই বীরভূমে র রাজাকে মানে রাজনগরের রাজা
মহম্মদ উজ জামান কে বকেয়া খাজনার দায়ে বন্দী করা হয়।
রাজাকে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করে তাঁর বিশাল জমিদারীর
দায়িত্ব দেওয়া হয় T H Earnest কে। তিনি বীরভূমএর জমিদারি কে ১৭৯৯ সালের মধ্যেই ৪২ টি পরগনা এবং ২২২ টি মহলে ভাগ করে ফেলেন। এবং এই সংখ্যা বাড়তেই থেকেছে। ছোট বড় নানা স্তরের নূতন নূতন জমিদার তৈরী হচ্ছেন। কোম্পানি র সাথে যাঁদের খাতির ভালো নানা খেতাব বিলি হচ্ছে। খাতির ভালো মানে ঘুষ। কর্তাদের পকেটে ঢুকছে। বেনামে কোম্পানি র কর্তারা ও জমিদারী কিনছেন।
  একদিকে পুরানো জমিদারী র অংশ বিক্রি। তার টাকা। উপঢৌকন এর টাকা। আর খাজনা বৃদ্ধি। টাকা। টাকা।
টাকার খিদে যেন মিটছেনা ইংরেজ প্রভু ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির। লুঠের খিদে কি আর মেটে। কবে আর কার মিটেছে।
----------------------     ----------------   --------------© প্রণব ভট্টাচার্য।
তথ্য সহায়তা।  জেলা গেজেটিয়ার। বীরভূম। ও ম্যালি।
রাঢ় ভাবনা পত্রিকা। সম্পা সৌরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়।
কৌলাল পত্রিকা। সম্পা। স্বপন ঠাকুর। বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গনে তে নিজস্ব প্রবন্ধ।

----------------------   -------------------------   ---------------------------
ছবি। প্রিয়ব্রত সাহা।  সহায়তা  দেবরূপ সরকার।
অদিতি সরকার।

কুঠি বাড়ি ভিত্তিক ব্যবসা বানিজ্য। সুরুল সরকার জমিদার বাড়ির কথা। দুর্গাপূজা

।। কুঠি বাড়ি কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য।।      পর্ব - ১০
----------------    --------------------      ----------
  দুর্গা পুজো বলে কথা।
  ব্যাপার সামান্য নয়। কত শত আয়োজন। তা হোক
  কুঠি বাড়িতে তো কম নয় স্থানীয় কর্মচারী।
সবাই চাইছে। চীপ সাহেব ও ফেলতে পারলেননা।।
সবার অনুরোধ।
ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। মন্দা মানেই নানা আশংকা।
দুর্গাপুজো হোক। যদি পুজোয় সন্তুষ্ট হয়ে মা মন্দা কাটিয়ে দেন।
আয়োজন হল চীপ সাহেবের কুঠি বাড়িতে দুর্গাপূজা র।
আয়োজনের কোন ঘাটতি নেই।
সাড়ম্বরেই পুজা অনুষ্ঠিত হল।
খরচ হল মোট ১৭ টাকা।
সময়টা আঠারো শতকের শেষদিক।
সতেরো টাকা মানে খুব কম নয়।
টাকায় দু মন চাল পাওয়া যেত সে সময়।
আর নীল চাষে লাভ। ৩ টাকা বিনিয়োগ করে ১০ টাকা আয়।
বীরভূমের অন্যতম প্রাচীন পুজো বলা যেতে পারে।
এ তো গেল কুঠিবাড়ি র পুজো।
এবার যাই সুরুলের সরকার বাড়ির পুজোয়।
যে বাড়ির ঐতিহ্যপূর্ণ পুজো দেখতে হাজার হাজার
  মানুষ আসেন। জমিদার বাড়ির পুজো বলে কথা।
গুরুদেব বাসুদেব ভট্টাচার্য মহাশয়ের নির্দেশে
ভারতচন্দ্র সুরুলে এসে পাকাপাকিভাবে বসতি
স্থাপন করেছেন। আসার পর থেকে একটু থিতু হয়েই
শুরু করেছেন কাপড়ের ব্যবসা। ধীরে ধীরে জমে উঠেছে ব্যবসা।  তাঁর ছেলে কৃষ্ণহরি সরকার। তাঁর অনুমতি নিয়েই
সরকার বাড়িতে শুরু হল দুর্গাপূজা।
তখন মাটির ঘর।  সেই সময়কাল অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি। পরবর্তী সময়ে এই বংশের সর্বাপেক্ষা সফল
ব্যবসায়ী  শ্রীনিবাস সরকার মশাই নির্মান করেন পাকা দুর্গাদালান। প্রাথমিক খরচ ১৮০০০ টাকা বেড়ে দাঁড়ায়
প্রায় দুই লক্ষ টাকায়। জমিদার বাড়ি তৈরী হল।
বিরাট সে প্রাসাদ। গোবিন্দ নামে মিস্ত্রী নির্মান করলেন।
আসল বেলজিয়াম গ্লাসের ঝাড়বাতি এল। যা এখনও ঝোলানো হয়। দেবী মূর্তির নানা আয়ূধ ; অলংকারাদি
এখনও প্রতিমাকে পরানো হয়। সবই সেই কালের।
একটি ট্রাস্টি বডি তৈরী হয়েছিল অনেক আগেই।
সেই ট্রাস্টি বডির মাধ্যমেই পূজা অনুষ্ঠিত হয় আজও।
মৌখিরা - কালিকাপুরএর জমিদার বাড়ির সাথে বৈবাহিক
সম্পর্ক ছিল সরকার বাড়ির। আমি মৌখিরার ' বুড়ো বাবু ' --
আমরা দাদা বলতাম। দাদা বৌদি খুব ভালো মানুষ। অনেক কথা তাঁদের কাছ থেকে শুনেছি। ভাল নাম তাঁর স্মরজিৎ রায়। বিশ্বভারতী র প্রথম যুগের ছাত্র শিবদাস বাবু তাঁর বাবা।
শিবদাস বাবুর কথা বলছি। তার আগে বলে নিই এই
মৌখিরা র রায় পরিবারের মেয়ে রাখালদাসী ছিলেন সরকার বাড়ির বৌ। একা এই মহিলা সিউড়ী যাতায়াত করে ডি;এম
সাহেব কে মাঝে রেখে এই ট্রাষ্টি বডি তৈরী করেছিলেন।
কতখানি দূরদৃষ্টি। আজও তাই পূজা চলছে।
এই শিবদাস বাবুর মাধ্যমে ই শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন এর অনেক জায়গা জমি সরকার বাবুদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে
পাওয়া গিয়েছিল।
ব্রাহ্ম বলে নাকি ঠাকুর দের জমি দিতে রাজী ছিলনা সরকার বাড়ি।  আরও কত কথা হয়তো জানতে পারতাম। কিন্তু
আকস্মিক ভাবে ই ' বুড়ো দা ' মারা গেলেন।
  আগের  দু টি পর্বে ই বলেছি এই সরকার বাবুদের কথা।
শ্রী নিবাস সরকার ই এই বংশের সর্বাপেক্ষা সফল ব্যবসায়ী।
এবং বিপুল অর্থ তিনি রোজগার করেছিলেন।
  মাতৃ শ্রাদ্ধে যিনি লক্ষাধিক টাকা খরচ করতে পারেন।
জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আসেন হাতির পিঠে চেপে। আর চীপ সাহেব তো আছেনই। পরামর্শ দাতা। নানা ভাবে সাহায্যকারী।
  পরিবারের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন।
  এই সরকার পরিবার অন্যান্য অনেক ধনী পরিবারের মতো
জমিদারি কিনেছিলেন। মনোহরশাহী পরগনায় ; বারবাক সিংহ পরগনায় ; চম্পানগরী পরগনা সহ অন্যান্য জায়গায়।
' কুখ্যাত সূর্যাস্ত আইনে ' খাজনার টাকা মেটাতে না পারলে ই
জমিদারি গেল। আর নূতন ধনী ; রাজকর্মচারী রা কিনলেন।
জমিদার হয়ে গেলেন।
১৭৯৩ সালের ' চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ' আইনের কথা আমরা জানি। বেশী বলার দরকার ও নেই।
১৭৯৫ সালেই বীরভূমে র রাজাকে মানে রাজনগরের রাজা
মহম্মদ উজ জামান কে বকেয়া খাজনার দায়ে বন্দী করা হয়।
রাজাকে সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করে তাঁর বিশাল জমিদারীর
দায়িত্ব দেওয়া হয় T H Earnest কে। তিনি বীরভূমএর জমিদারি কে ১৭৯৯ সালের মধ্যেই ৪২ টি পরগনা এবং ২২২ টি মহলে ভাগ করে ফেলেন। এবং এই সংখ্যা বাড়তেই থেকেছে। ছোট বড় নানা স্তরের নূতন নূতন জমিদার তৈরী হচ্ছেন। কোম্পানি র সাথে যাঁদের খাতির ভালো নানা খেতাব বিলি হচ্ছে। খাতির ভালো মানে ঘুষ। কর্তাদের পকেটে ঢুকছে। বেনামে কোম্পানি র কর্তারা ও জমিদারী কিনছেন।
  একদিকে পুরানো জমিদারী র অংশ বিক্রি। তার টাকা। উপঢৌকন এর টাকা। আর খাজনা বৃদ্ধি। টাকা। টাকা।
টাকার খিদে যেন মিটছেনা ইংরেজ প্রভু ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির। লুঠের খিদে কি আর মেটে। কবে আর কার মিটেছে।
----------------------     ----------------   --------------© প্রণব ভট্টাচার্য।
তথ্য সহায়তা।  জেলা গেজেটিয়ার। বীরভূম। ও ম্যালি।
রাঢ় ভাবনা পত্রিকা। সম্পা সৌরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়।
কৌলাল পত্রিকা। সম্পা। স্বপন ঠাকুর। বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গনে তে নিজস্ব প্রবন্ধ।

----------------------   -------------------------   ---------------------------
ছবি। প্রিয়ব্রত সাহা।  সহায়তা  দেবরূপ সরকার।
অদিতি সরকার।

ইলামবাজার। এলেমবাজার। নীলামবাজার

। ।এলেমবাজার। নীলামবাজার। ইলামবাজার।।। 

না। তুলাপট্টিতে কোন নীলামের বাজার আর বসেনা আজ। 
  তুলাপট্টিতে একদিন সুতা ; তুলা ; তসরের থান ; সুতী বস্ত্রের নীলামের বাজার বসত। কত এলেমদার মানুষ দের আনাগোনা। আজ যদি  বলেন যে তুলাপট্টি জায়গাটি কোথায় - ইলামবাজার এর আজকের যে কোন মানুষ চুপ করে থাকবেন। কে আর খোঁজ রাখে। কি হবে সে অতীত কে জেনে।
পুরানো থানার পাশে বিস্তৃত মাঠে সে হাট বসত একদিন।
জেলা গেজেটিয়ারে  ও' ম্যালি বলছেন। ১৯১০ সালে।
গুরুসদয় দত্ত মশাই তখন বীরভূমে র জেলা কালেক্টর।
ইলামবাজারে উদ্বোধন করছেন একটি দাতব্য চিকিৎসা লয়।
সেই মার্বেল ফলকটি কি আজকের গ্রামীন হাসপাতালে র কোন কক্ষে সংরক্ষিত হয়েছে কি না  জানিনা।
আজকের পোষ্ট অফিস গড়ে উঠেছে আরস্কিন সাহেবের কুঠি বাড়ির কিছুটা জায়গা নিয়ে। আর সেই বিরাট চারদিক খোলা বারান্দার ডাকবাংলো। আরস্কিন সাহেবের আউটহাউস।
নিশ্চিহ্ন। সেই উঁচু মোটা ভিতের মোটা থামের খোলা বারান্দার আরামদায়ক বাংলো বাড়ি। যেখানে কেন্দুলীর মেলা দেখতে যাবার পথে একরাত্রি বিশ্রাম নিয়েছিলেন সস্ত্রীক সিলভা লেভী র মতো পণ্ডিত। শান্তিনিকেতন থেকে এসেছিলেন।
সংলগ্ন এলাকার উত্তর দিকে ছিল আরস্কিন পরিবারের সমাধি স্থল। ছোট্ট কিন্তু সুন্দর। প্রত্যেকটি সমাধি। সাদা মার্বেল ফলকে লেখা নাম ; জন্ম সাল ; জন্ম স্থান ; মৃত্যু তারিখ।
কোথায় জন্ম ইংল্যান্ড এর কোন শায়ারে। আর মৃত্যু এই ইলামবাজারে। 
ছোটবেলায় ইলামবাজার হাইস্কুলে পড়তে গেলাম। ক্লাস নাইন থেকে। আমাকে কেউ বলেনি। কেউ দেখায় নি। একদিন খুঁজে পেয়েছিলাম।
কোথায় জন্ম আর কোথায় মৃত্যু!  আমার মন কেমন করত।
মাঝে মাঝে গিয়ে কবরস্থানে বসে থাকতাম।
পাশেই উত্তরে ফরাসী কুঠির একটা ভাঙ্গা দেওয়াল। দেওয়াল টি বেশ উঁচু। নিশ্চিত ভাবেই দোতালা ছিল।
  আজ সব নিশ্চিহ্ন। নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যই নিশ্চিহ্ন। 
না আমরা রক্ষা করিনি। করার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে ই করিনি। সব ইঁট ; কাঠ ; পাথর ; সাদা মার্বেল ফলক সব ছাড়িয়ে দিনের পর দিন নিয়ে চলে গেছি।
আজকের ইলামবাজারে সেদিনের ইলামবাজার কে খোঁজা মূর্খামি।
  আজ সে এক বিরাট গঞ্জ। মিউনিসিপালিটির মতো বিস্তৃতি।
চারপাশের গ্রাম থেকে অবস্থাপন্ন মানুষেরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। মূল ইলামবাজার কে আজ খুঁজে পাওয়া দায়।
আমাদের ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে কি কোথায় কিজন্য বিখ্যাত এই পর্বে লেখা থাকত- ইলামবাজার। বীরভূম জেলায়।লাক্ষা বা গালা শিল্পের জন্য বিখ্যাত কেন্দ্র।
এলেমবাজার। বাজারে এলাম গো। যে বাজারের ' এলেম ' মানে দাম আছে। কত সম্ভ্রান্ত মানুষজনের আনাগোনা।
নীলাম বাজার। হাঁকডাকের বিরাট বাজার। হতে পারে নীলাম থেকে ইলামবাজার।
আর ইলম বা ইলাম মানে ই তো লাক্ষা বা গালা। তার বাজার।
  আর আজ একঘর ' নুড়ি ' বা লরি নেই যারা গালার কাজ করেন। সব পদবী বদলে নিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই পেশাও। 
শেষ দুই ভাই ছিলেন নেপাল আর গোপাল গুঁই।ঘাড় গুঁজে অবসন্ন চিত্তে টুকটাক কাজ করতেন। মলিন বেশ। ম্লান আলো চোখে। 
রবীন্দ্রনাথ এই দুই ভাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রশিক্ষক হিসাবে শ্রীনিকেতনের শিল্প সদনে। শেষ চেষ্টা করেছিলেন।( চলবে)

আরস্কিন সাহেবের সিমেট্রি র ছবি সত্যশ্রী উকিল দার কাছ থেকে পেয়েছি। মুকুল দে মশাই এর তোলা। এ ছবি অন্য আর কারোও কাছে বোধহয় নাই।

কুঠি বাড়ি ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য। সেই সময়কাল

। সেই সময়কাল।
১৭৫৭। পলাশী র অবিশ্বাস্য সর্বনাশ। 
হঠাৎ রাজা বেণিয়া ইংরেজ। 
১৭৭০। ছিয়াত্তর এর মহা মন্বন্তর। 
১৭৭১। সুপারভাইজার হিগিনসনের রিপোর্ট " বীরভূম জনমানবহীন বন্ধ্যা দেশ"। 
বীরভূমের ৬০০০ গ্রামের মধ্যে ১৫০০ গ্রাম নিশ্চিহ্ন। 
কৃষিজমি সব পতিত পড়ে আছে। কে করবে চাষ। চাষী কি আর বেঁচে আছে ছাই। নাই। নাই। চাল নাই। ভাত নাই। ফ্যান নাই। 
যে চাল এক টাকায় ২-৩ মন পাওয়া যেত। তার দাম টাকায় ৩ সের। কে কিনবে। আর কোথায় পাবে। 
না খেতে পেয়ে মারা গেল এত এত মানুষ। 
গণহত্যা ই বলা উচিৎ। 
সংগঠিত গণহত্যা।
অথচ সারা জেলা জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে ইউরোপীয় বণিক দের দল। কোথায় কোন ব্যবসা ভাল হবে। এলাকা চিহ্নিত করছে।
বীরভূমের পূর্বাংশে ভালো রেশম।
পরে আমরা দেখব গুনুটিয়া য় গড়ে উঠবে রেশম কুঠি।
বিখ্যাত সে কুঠিবাড়ি।
সুতীবস্ত্র ; তসর ; রেশম ; লাক্ষা বা গালা ; নীল ;গুড় ; 
লোহা পাথর - সব কিছুর ভাবনা তাদের মাথায়। 
উপযুক্ত জায়গা জমি চাই। স্থানীয় সমস্যা মোকাবিলা র জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী লোক চাই। 
নায়েব ; গোমস্তা ; ধরনের লোকগুলোকে চাই। 
আর চাই দালাল শ্রেণী র মানুষ গুলো কে। 
তাদের সাথে ব্যবসা করার জন্য স্থানীয় ধনবান দের সঙ্গে চাই। তাদিকে যুক্ত করতে হবে। জাত বেণিয়া হিসেব পাকা।
পরে আমরা দেখব সুরুলের সরকার বাড়ি ; রাইপুরের সিংহ বাবুরা বিশাল বিত্তশালী হয়ে উঠছেন ইংরেজদের সাথে ব্যবসা করে বা সহযোগিতা করে। তাঁদের সাথে ব্যবসা করেই তাঁরা জমিদার।
ফরাসী এবং ইংরেজ দের সহায়তায় সিংহ বাবুদের পরিবারের দুই সন্তান সত্যেন্দ্রপ্রসাদ এবং নগেন্দ্রপ্রসাদ বিলাত যাচ্ছেন। লর্ড হচ্ছেন।
সেই সময়ে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি র বদান্যতা য় অনেক তালুকদার ; পত্তনিদার ; জমিদার বনছেন।
মুর্শিদাবাদ নবাব দরবার থেকে নানা খেতাব জূটছে অনেকের। লুঠের ব্যবসায় সক্রিয় সহযোগিতা করে। 
লক্ষ্য করার মতো বিষয় বীরভূম থেকে আদায়কৃত রাজস্ব কিন্তু কমেনি। অতএব আরও রাজস্ব আদায় করতে হবে।
বীরভূম শুধু নয় সারা বাংলা জুড়েই ছুটে বেড়াচ্ছে সাদা চামড়ার দল। সবার আগে এসেছে আর্মেনিয়ান রা তারপর ফরাসী রা ; ইংরেজ ; ডেনিশ রা।
ঠিক এই সময়েই সিভিল সার্ভিস থেকে মি: জন চীপ কে কমার্শিয়াল রেসিডেণ্ট করে বীরভূমে পাঠানো হল। 
কমার্শিয়াল রেসিডেণ্ট। অর্থাৎ যাঁর প্রধান কাজই হল 
বাণিজ্যের বিস্তার। এবং ব্যবসা থেকে রাজস্ব আদায়। 
  তিনিই প্রথম। মি: জন চীপ এলেন। ১৭৮২ সালে। 
  সুরুলে এলেন। পাকা পাকি ভাবে থাকা র ব্যবস্থা করলেন। 
বানালেন " দুর্গতুল্য " কুঠি বাড়ি। কি চমৎকার তার বর্ণনা । ইংরেজ সাহেব দের রিপোর্ট। পরের পর্বে শোনাব। 
( চলবে)
ছবি পরিচিতি। রাইপুর সিংহ বাবুদের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। ছবি। প্রিয়ব্রত সাহা

গ্রন্থ সহায়তা। জেলা গেজেটিয়ার  ও ' ম্যালি বীরভূম। 
রাঢ়ভাবনা পত্রিকা। সম্পাদক সৌরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। বিশেষ সংখ্যা। নীল রেশম লাক্ষায় বীরভূম। 
কৌলাল। সম্পাদক স্বপন ঠাকুর। নিজের লেখা প্রবন্ধ।

কুঠি বাড়ি ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য।সাহেব ঘাট

আবার ফিরিয়ে দিলাম 
পুরনো পোষ্ট ।সাহেব ঘাট।। 
। কুঠিবাড়ি ভিত্তিক সেদিনের ব্যবসা বাণিজ্য।। পর্ব  -
ঘাটের নামই হয়ে গিয়েছিল সাহেব ঘাট।
ইলামবাজার খয়েরবুনি র শিমূল তলার ঘাট।
অজয়ের এই ঘাটে সারাদিন ই ছোট বড় নানা নৌকো র আনাগোনা।
ঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলদ গোরুর অনেক গাড়ি।
মাল উঠছে। নামছে। কত রকমের সে সব জিনিষ।
পশ্চিম দিক থেকে গঙ্গাপুরের ঘাট _
ছুঁয়ে এই ঘাটে।
পশ্চিমে সেনপাহাড়ী র জঙ্গল ভূমি। সেই জঙ্গল ভূমির
তখন নামই হয়ে গেছে ' লা মহল '।
মানে লাক্ষা মহল। প্রচুর মাল আসে সেখান থেকে।
আবার আরো পশ্চিমে এখনকার ঝাড়খণ্ডের লাগোয়া
জঙ্গল ভূমি থেকে। ওদিকের লাকরাকোন্দা বেশ বড়
ব্যবসাকেন্দ্র। সেখান থেকে ও মাল আসে।
ইলামবাজার Erskine সাহেবের বিশাল কুঠিবাড়ি।
বড় বড় গুদামঘর। সেখানে মাল গুদাম জাত হচ্ছে।
সাহেবের বসবাসের বাংলো পাশ দিয়ে আমবাগানের
পাশ দিয়ে রাস্তা। লাল মাটি। মোরামের রাস্তা।
সাহেব গিন্নী সংসারের যে টুকু সামান্য কাজ তা সেরে
  সারাদিন পশ্চিমের জানালা খুলে বলদ গোরু গাড়ির
চলে যাওয়া সারি দেখেন। পরপর সার দিয়ে চলেছে।
সাহেবের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
তাই ভালো কি আর না লাগে তাঁর।
দ্বারোন্দার পর এই ইলামবাজার কুঠি।
সুরুলে আছেন চীপ সাহেব। বিশাল যেমন তার কুঠিবাড়ি।
দাস দাসী  ; চাকর বাকর ; কতো এ দেশীয় কর্মচারী।
বাগান ; চিড়িয়াখানা ; জলাশয় নিয়ে তার কুঠিবাড়ি।
তিনি ' বড়ো সাহেব '।

এর আগে আমরা ইলানবাজার এর আরস্কিন বা আরস্কাইন সাহেবের কুঠিবাড়ি নিয়ে লিখেছি। তাই তার আর পুনরাবৃত্তি
করছিনা এখানে। লাক্ষা বা গালা আর নীলের ব্যবসা এখানে।
অন্য কথায় আসি
ইলামবাজার এর ' লরি ' বা নুড়ি রা তো গালার কাজ আগে থেকেই জানতেন বা নানা জিনিষ তৈরী করতেন।
মেলা খেলায় সে সব বিক্রি হত। ইলামবাজার হাটতলার পশ্চিমে লরিপাড়া। বসুধা র লরি রা ও তাঁদিকে গালা বেচতেন।
অবাক হতে হয়। ১৮৫৫ সালে প্যারিসে এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী তে Exposition Universelle তে প্রদর্শ বস্তুর মধ্যে
বিশেষ স্থান পেয়েছে ইলামবাজার এর গালা শিল্পের উৎকৃষ্ট
সব শিল্প বস্তু। 'of excellent design and craftsmanship '।
এখানকার গালার শিল্প বস্তুর  দারুন চাহিদা ছিল।
মুর্শিদাবাদ নবাব মহলে এমনকি বীরভূমের রেশমের মতো
মোগল হারেমে এখানকার গালা দ্রব্যের ভীষণ চাহিদা ছিল।
  আর ছিল এক দারুন জিনিষ। বিশেষ পদ্ধতি তে তৈরী
গালার থালা বাটি। বিষ মেশানো খাবার তাতে পরিবেশন করলে কিছুক্ষণের মধ্যে পাত্র ফেটে যেত।
যেখানে শুধু অবিরাম নানা চক্রান্তের জাল বোনা হচ্ছে
সেখানে কি এ জিনিষের কদর না হয়।
  সে আমাদের এই ইলামবাজার। এখানের তৈরি সামগ্রী।
এই অতীতের জন্য গর্ব হওয়া উচিৎ।
আমি জানিনা কজন ইলামবাজার বাসী এ খবর রাখেন।

এই পর্ব এখানেই শেষ করি।
আরস্কাইন সাহেবের পারিবারিক সমাধি স্থল। ছবি সৌজন্যে
সত্যশ্রী উকিল।
অন্য সব ছবি আমার ই তোলা
গ্রন্থ সহায়তা। জেলা গেজেটিয়ার। বীরভূম। ও ম্যালি। 
নিজের প্রবন্ধ। কৌলাল প্রকাশিত  বঙ্গ সংস্কৃতি র অঙ্গনে। 
পত্রিকা। রাঢ় ভাবনা। সম্পা। সৌরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায় 
------------------------------------------------------------------( চলবে)

কুঠিবাড়ি কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য। দ্বাদশ পর্ব।

কুঠি বাড়ি কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য কথা।।  পর্ব - দ্বাদশ
----------------------------------------------------   ------------------
জতুগৃহ।
বললেই মনে পড়বে আমাদের সেই মহাভারতের কথা।
বারাণাবতের জতুগৃহের কথা।
জতৃ থেকে জতু।
আর জতু মানে গালা। দারুন দাহ্য পদার্থ।
তাকে চিনি আমরা অনেক প্রাচীন কাল থেকেই।
বারাণাবতের জতুগৃহ বানাতে যায় নি তো আবার আমাদের
এই ইলামবাজার  বীরভূম থেকে
কেন বললাম  সে কথা বলি
অজ্ঞাত বসের সময় পাণ্ডবেরা বীরভূম সহ এই এলাকায়
এসেছিলেন । পাণ্ডবেশ্বর ; ভীমগড় প্রভৃতি নামে তারই প্রভাব।
অনেক পণ্ডিতের ধারনা সেদিনের বারাণাবত এখনকার
বীরভূমে র নলহাটি থানার বারা গ্রাম।
এই বারাগ্রাম সুপ্রাচীন। অনেক পুরাকীর্তি সেখান থেকে মিলেছে। অবস্থান গত পারিপার্শ্বিকতা দেখেই পণ্ডিতেরা এই
মত পোষণ করেছেন। বিখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক ড: অতুল সুর
ঐ মত সমর্থন করেছেন।
তাহলে তো জতুগৃহ নির্মানে নিশ্চিত ভাবেই এই এলাকার
মানে বীরভূমে র প্রাচীন গালা উৎপাদক অঞ্চল ইলামবাজার থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা ই বেশী।
  আর মুর্শিদাবাদ নবাব দরবার থেকে শুরু করে দিল্লী শাহী দরবারে এই গালার তো বিপুল চাহিদা।
আগের পর্বে ই বলেছি বিষ মেশানো খাবার সনাক্ত করনের জন্য বিশেষ পদ্ধতি তে তৈরি থালা বাটি প্রভৃতি তৈজসপত্র
এর কথা।
আর সিল মোহরের জন্য গালার ব্যবহার তো চলছে এখনও।
  ইলামবাজার সেই গালা শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। বিখ্যাত trade mart।
   এমনকি সাজসজ্জা তেও এই গালার ব্যবহার। গালার অলংকারাদি ; পুতুল খেলনা ; এসব ছাড়াও উদ্যান সজ্জাতে
ব্যবহৃত হত গালার তৈরী নানা মূর্তি।
শিবশংকর ঘোষ মশাই তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন
মুর্শিদাবাদ এর নবাব সুজাউদ্দিন এর বিলাস ভবন ' ফরাসবাগ '। সেখানে ইলামবাজার এর গালা শিল্পী দের তৈরী
এক নয়ন মনোহর এক জতুবৃক্ষ দিয়ে না কি সজ্জিত ছিল
উদ্যান। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে হলুদ ফুল ফল আর পাখি দের সমাহার। এক অনন্য শিল্পকর্ম।
  বোধহয় আগেও লিখেছি ১৯০১ সালে ই ইলামবাজার এর জনসংখ্যা ১৮১৫ জন। Trade mart ইলামবাজার এবং আশেপাশের গ্রামগুলির মানুষ সহ মোট ২২৩৫ জন নানা ভাবে এই শিল্পে নিয়োজিত। কিন্তু অতি দক্ষ artisan তখনই মাত্র দু জন। অলংকার নির্মাতা রা বা খেলনা নির্মাতারা ছিলেন।
সেই যে দুই ভাই গোপাল আর নেপাল গুঁই এর কথা বলেছিলাম। অবসন্ন চিত্তে টুকটাক কাজ করতেন।
শ্রী নিকেতনের শিল্প সদনে রবীন্দ্র নাথ নিয়ে গিয়ে ছিলেন
গালা শিল্পের প্রশিক্ষক হিসাবে। নেপাল বাবু আর্থিক অবস্থার কারণে কাজ ছেড়ে পান বিড়ির দোকান দেন। গোপাল বাবু আবার যোগ দিয়ে ছিলেন। তিনি মারা গেলে তাঁর ছেলে অজিত গুঁই চেষ্টা করেছিলেন ঐতিহ্যের এই গালা শিল্প কে
ধরে রাখতে। কিন্তু বিভাগ টি ই বন্ধ হয়ে যায়।
আজ আর ইলামবাজারে একঘর ও গালা শিল্পের সাথে যুক্ত
মানুষ নাই। ঐ পরিবারের লক্ষীকান্ত কে খুঁজে বের করেছিলাম সব্জী বাজারে। এই এখন তাঁর পেশা।
অন্যেরা পদবী বদলে নিয়েছেন। কেউ আর ' নুড়ি ' বা লরি নামে পরিচয় ও দেননা। অনেকে স্বর্ণকার হয়ে গেছেন।
যাঁরা সেই সুদিনে ভালো রোজগার করেছিলেন তাঁরা এখন
নানা ব্যবসায়ে নিয়োজিত। কোন কোন পরিবার যথেষ্ট ধনী হয়েছিলেন। গালার ব্যবসা করে।
সে দিন আর নেই। থাকার কথা ও নয়। সস্তার রাবার ; প্লাস্টিক এসে যাবার পর কে আর কিনবে মাটির পুতুল ; বা গালার পুতুল। কে পরবে গালা র তৈরী অলংকার।
মেয়েরা কি পরবে নাপিতিনি হাতে সেই ' যাবক ' বা আলতা।
যা তৈরী হত গালা প্রস্তুতি করনের এক পর্যায়ে।
না কি নুড়ি বাড়ির মেয়ে বৌরা সেই রঞ্জক পদার্থ দিয়ে রাঙাবে সুতো। আর সেই সুতো য় শুখবাজারের তাঁতী রা বানাবে নানা সুতী বস্ত্র। একঘর তাঁতী ও আর নেই যাঁরা তাঁত বোনেন।
ইলামবাজার হারিয়েছে তার অতীত গৌরব কে।
  হারিয়েছে ঐতিহ্য। যেভাবে আমরা প্রতিদিন হারাচ্ছি।
----------------------------------------------------@ প্রণব ভট্টাচার্য্য

শিমূল তলার সাহেব ঘাট

।। কুঠি বাড়ি কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য।।  ত্রয়োদশ  পর্ব।

১৭৯২ সাল নাগাদ চীপ কোম্পানির কাছ থেকে ৫০০ মন গালার জন্য ১০০০০ টাকা এবং ১৮০০ সালে ৫৪৪ মন গালার জন্য ৯৯১৫ টাকা পেয়েছিলেন আরস্কাইন সাহেব।
কিন্তু কি কারণে যে আরস্কাইন সাহেব লাক্ষার জন্য লগ্নী বন্ধ করে দেন জানা যায় না।   কিন্তু বিদেশে গালার চাহিদা কমেনি। তাই এই ব্যবসায়
দেশীয় অনেক ধনী মানুষ পুঁজি নিয়োগ করেন।
শেরউইল এর রিপোর্ট ১৮৫২ সাল থেকে জানা যায়  কুণ্ডহিত কড়েয়ার জঙ্গল থেকেই আগের বছর ১৫০০০০ টাকার লাক্ষা পাওয়া গিয়েছিল।
আরস্কাইন সাহেব গালার ব্যবসায় বিনিয়োগ বন্ধ করে দিলে
মেসার্স ফারকুহারসন এবং পরে ক্যাম্পবেল সাহেব এই ব্যবসা কিছুদিন চালিয়ে ছিলেন। ১৮৮২ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়।
যদিও ১৯০৯-১০ সাল পর্যন্ত ইলামবাজার এর স্থানীয় নুড়ি সম্প্রদায় গালা সংগ্রহ বা নিষ্কাশন করত। ইলামবাজার এর হাটতলার পশ্চিমে নুড়ি পাড়ায় কাজ চলত।
গালা বা লাক্ষা -  লক্ষ লক্ষ গুটিপোকা র দেহ নিঃসৃত রস থেকে এই প্রাকৃতিক রেজিন সংগৃহীত হত। তাই লাক্ষা।
আবার গলন বা গলানো থেকে গালা এমন টা ও হতে পারে।
ইলামবাজার এবং তার সংলগ্ন জঙ্গল ভূমি র  কুসুম ; পলাশ ; কুল ; অশ্বত্থ গাছের কচি ডালে লক্ষ লক্ষ গুটি পোকা বাসা বাঁধত। এই সব গাছের কচি পাতা ছিল গুটিপোকা দের খাদ্য।
তাদেরি দেহ নিঃ সৃত রসে তৈরী করত তাদের নলাকৃতি বাসা। আবার ঐ বাসার মধ্যেই গুটিপোকা দের মৃতদেহ embeded হয়ে যেত। মূলতঃ জঙ্গলের মধ্যে আদিবাসী পল্লী গুলির বাসিন্দারা গাছ থেকে সেই সব কচি ডাল কেটে আনত।
সেই ডালে থাকত পুঞ্জ পুঞ্জ লাক্ষাকীট এর তৈরী নলাকৃতি বাসা। অর্ধস্বচ্ছ হলদেটে রঙের গালা। তার পর তা ডাল থেকে ছাড়িয়ে গুঁড়ো করা। তারপর জলে ভেজানো। তারপর জল থেকে তুলে রোদে শুকানো। উপরের জল কে গন্ধক মিশ্রিত করে কার্পাস পাতা দিয়ে ফোটালে পাওয়া যেত গিরি লাল রঙের রঞ্জক পদার্থ।
যার নাম ' যাবক ' বা আলতা। তা দিয়ে সুতো রাঙানো হত।
মেয়ে রাই একাজ করত। আবার মেয়েদের পায়ে পরার আলতা হিসাবে নাপিতানি রা ব্যবহার করত।
নীচে অধঃক্ষেপিত পদার্থ কে ভালো তাপে গলানো হত।
জ্বালানী হিসাবে ভালো শাল কাঠ লাগত।
তারপর সেই গলন্ত তরল গালাকে নানা ছাঁচে ফেলা হত।
নানা আকৃতি র।  বোতাম থেকে চাকতির মতো। খুব পাতলা
leaf গালা র কদর বেশী। আবার কুসুম গাছের গালা র দাম ও বেশী। তারপর বস্তা বন্দী করে চালান করা হত।
লালচে মোটা গালার দাম কম। খুব পাতলা হলদেটে গালার দাম বেশী। সে আজ ও।
গালার চাহিদা আজও কমেনি। সে রঙ শিল্পেই হোক আর কাঠের আসবাব পত্র বার্নিশ করার জন্য ই হোক। তা ছাড়াও গালার ব্যবহার নানা ক্ষেত্রে।।
আমাদের বীরভূম এর ইলামবাজার  গালা বা নীল শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হলেও  বীরভূমের নানা স্থান ছাড়াও  বাঙ্গলার বিভিন্ন জেলাতে বা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে লাক্ষা র চাষ হত।  বিদেশে ও হত। এ এক প্রাচীন শিল্প।
  আমরা জানি ১৮৮২ সালের পর নীল বা গালার ব্যবসা
কুঠিবাড়ি ; ফ্যাক্টরি ; গুদাম ঘর সব কিনে নেন বাঁকুড়া র
বাবু  রায় বগলানন্দ মুখার্জী। তিনি  তাঁর আত্মীয় দের সাহায্যে  আরও কিছু দিন ব্যবসা চালিয়ে ছিলেন। গালা আরও অনেক দিন চলেছিল।
এখনও ইলামবাজার ব্রাহ্মণ পাড়ায় ভাঙ্গা দেওয়াল ঘেরা
  একটা জায়গা আছে যেখানে একসাথে বসে গালা শিল্পী রা
কাজ করতেন। নুড়িরা স্বাধীন ভাবে নিজেদের বাড়িতে বসেও আবার এই খানে বসে সব উপকরণ নিয়ে ঠিকা প্রথাতেও কাজ করতেন।
   সেই স্থান কজনই বা চেনেন। আর চিনে হবেই বা কি।
হারিয়েছে ঐতিহ্যের গালা শিল্প। কালের নিয়মে যেমন অনেক কিছু হারায়। আবার অনেক কিছু নতুন আসে।
ইলামবাজার এর তুলা পট্টিতে আর কোন তুলার বাজার ও বসেনা। নীলাম ও হয়না। নুড়িরা হারিয়েছে।
বেঁচে আছে কিছু নাম নুড়ি পুকুর ; নুড়ি গোড়ে ; চাঁদপুকুর ;
সরান গোড়ে আর তার পাশে পাশে বড় বড় ভাঙ্গা চৌবাচ্চা।
আর নীল ডাঙ্গা ; নেলেগড় ; সাহেব ডাঙ্গা এই সব নাম।
এই সব নামের মধ্যে ই বেঁচে আছে সেদিনের নীল ; গালা শিল্পের স্মৃতি।
--------------------------------------------------------@ প্রণব ভট্টাচার্য্য

তথ্য সহায়তা।  জেলা গেজেটিয়ার। বীরভূম। ও ম্যালি।
পত্রিকা। রাঢ় ভাবনা। নীল গালা বিশেষ সংখ্যা। সম্পা।
সৌরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায়।
কৌলাল প্রকাশনীর  বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গনে। নিজের প্রবন্ধ
সম্পা। স্বপন ঠাকুর