Tuesday, 26 June 2018
নদীগর্ভ
নদীগর্ভ - মাতৃ গর্ভ
--------------------প্রণব ভট্টাচার্য
নদী র সাথে নারী র মিল যে আছে এটা মানুষ অনেকদিন আগেই বুঝেছে।
আর নারী সে তো মায়ের মতোই।
লালন পালন করে।আর জলইজীবন - সে বোধ
তো প্রায় সাথে নিয়েই জীব জন্মায়।
আর যেদিন চাষ শিখল। বুঝলো জলের মর্ম।
সারা বছর জল দেয়। বয়ে যায়। বয়ে আসে। নদী সে বড় অবাক করা ব্যাপার।
নদী গর্ভ মাতৃগর্ভ এর মতো।
সেখানে কর্ষণ পাপ।
এই ধারনা খুব পুরোনো। মানুষ নদী গর্ভে চাষ করেনি।
আজ আর সে দিন নাই।
চরায় চাষ তো করছেই। এতোদিন চরা ছেড়ে
নীচে নামেনি। এখন তো সেই সব চরা অতি উর্বর জমি হয়ে গেছে। তিনবার চাষ হচ্ছে।
কিন্তু জমি তো বাড়েনা। মানুষ বাড়ে। আর যাদের সব ঘরে বাড়ে তারা আর কি করবে চাষ ছাড়া।
যদি হাতের কাজ শিখত ; শেখানোর ব্যবস্থা থাকত; ছেলে মেয়েদের হাতে কাজ থাকত ; কল কারখানা যদি হত -
অতএব সেই চাষ। এই বোরো মরশুমে ধান বর্ষা র চেয়ে ভাল হয়।
কিন্তু জমি। না। সে তো আর নেই। সব বসে গেছে। কেউ ছাড়তেই চায়না।
----- পরেরপাতায়-----
শ্যাওড়া গাছে ভয়
শ্যাওড়া গাছের-
--------------------- প্রণব ভট্টাচার্য
কি। নামেই ভয়।
আচ্ছা শ্যাওড়া গাছে ভূত পেত্নী দত্যি দানো
গুলো কতদিন আগে চেপেছিল বলুন দেখি।
সে কোন ঠাকুরদা - ঠাকুরমার কালে -
যাইহোক চেপে কিন্তু এখন ও আছে।দিব্যি আছে।আহা থাকুক থাকুক। আরে এ বাংলায় ভূতেদের ভবিষ্যৎ বেশ ভালোই আছে।
তো। গাছ গুলো সব কোথায় যে গেল।
শ্যাওড়া বলেও রক্ষা পেলনা। নদীর ধারে; বাঁধের গায়ে গায়ে; মাঠের ধারে কত ছিল।ঝোঁপ ঝোঁপ। আবার লম্বা হয়ে উঠে যাওয়া কাষ্ঠল গুঁড়ির। সব প্রায় চলে গেল। এখনো যে একেবারে নেই তা নয়।আছে। শ্যাওড়া ছাড়া আসর জমে! যে গাছের তলায় সিঁদূর লেপা পাথর আর দু চারটে মাটির ঘোড়া; দুপাশে দুটো চাঁদমালা- ব্যস আসর জম জমাট।
সে গাছ দিব্যি আছে। বহাল তবিয়ৎ এ।
অন্য অনেক জায়গা তেই আছে। সব ই কোন না কোন
ঠাকুরের থান। নানা নামে ধর্মঠাকুরের থান ই বেশী।
আটন তার।
প্রতি বছর ১৩ ই বৈশাখ কালুবীরের পূজা। ডোম রা করেন। মনে পড়ছে নিশ্চয় ই। ধর্ম্মমঙ্গল কাব্যের বীর কালু ডোমের কথা।
কালু কে না পেলে তো লাউসেনের জেতা হতনা।
লাউসেন তলা এখন ও রয়েছে। আছে অনেক গাছপালা। শ্যাওড়া তো আছেই।
এই লাউসেন তলাতেই মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল
ইছাই ঘোষের সাথে লাউসেন এর। বৃদ্ধ ইছাই হেরেছিলেন। মরেছিলেন।
দু পক্ষের মারাত্মক যুদ্ধে বহু সৈন্য কে মরতে হয়েছিল রক্ত গড়িয়ে গিয়েছিল
' রক্তনালা' দিয়ে।
কালু বীর ও মারা গিয়েছিল। তাঁর স্মৃতি তে জয়দেব কেন্দুলি র কাছে সুগড় গ্রামের ডোম সম্প্রদায় এর মানুষজন; যাঁরা নিজেদের কালুর বংশধর মনে করেন; তাঁরা ১৩ ই বৈশাখ তাঁর স্মৃতি তে পূজা করেন আমাদের এই জংগল মহলে এই সেনপাহারী পরগনায় সব আঁকুড়ে ডোমরা নানা থানে তাঁর পুজো করেন।
আর একটা বিষয় ঐ ১৩ ই বৈশাখ গ্রামের
মানুষ জন একটি ছোট শ্যাওড়া ডাল ঘরের চালে গুঁজে দেন। ঘরে বাজ পড়বেনা - এই বিশ্বাস।
শ্যাওড়া র সাথে আগুন এর কোন সম্পর্ক আছে নাকি।
শুকনো দুটো ডালে ঘষে আগুন ধরাতে এক বৃদ্ধ আদিবাসী মানুষ কে দেখেছিলাম।সেই কোন ছেলে বেলায়।
একটা ছোট্ট টুকরোর মধ্যে গর্ত।আর সেই গর্তের ভিতর আর একটা টুকরো ঢুকিয়ে দড়ির টানে ঘর্ষণ তৈরী করে আগুন জ্বালানো। শোলায় সেই আগুন কে নিয়ে নেওয়া।
সেই মানুষ টি ই
বোধ হয় শেষ অগ্নিহোত্রী।
----------------
---------
শ্যাওড়া গাছে ভয়
শ্যাওড়া গাছের-
--------------------- প্রণব ভট্টাচার্য
কি। নামেই ভয়।
আচ্ছা শ্যাওড়া গাছে ভূত পেত্নী দত্যি দানো
গুলো কতদিন আগে চেপেছিল বলুন দেখি।
সে কোন ঠাকুরদা - ঠাকুরমার কালে -
যাইহোক চেপে কিন্তু এখন ও আছে।দিব্যি আছে।আহা থাকুক থাকুক। আরে এ বাংলায় ভূতেদের ভবিষ্যৎ বেশ ভালোই আছে।
তো। গাছ গুলো সব কোথায় যে গেল।
শ্যাওড়া বলেও রক্ষা পেলনা। নদীর ধারে; বাঁধের গায়ে গায়ে; মাঠের ধারে কত ছিল।ঝোঁপ ঝোঁপ। আবার লম্বা হয়ে উঠে যাওয়া কাষ্ঠল গুঁড়ির। সব প্রায় চলে গেল। এখনো যে একেবারে নেই তা নয়।আছে। শ্যাওড়া ছাড়া আসর জমে! যে গাছের তলায় সিঁদূর লেপা পাথর আর দু চারটে মাটির ঘোড়া; দুপাশে দুটো চাঁদমালা- ব্যস আসর জম জমাট।
সে গাছ দিব্যি আছে। বহাল তবিয়ৎ এ।
অন্য অনেক জায়গা তেই আছে। সব ই কোন না কোন
ঠাকুরের থান। নানা নামে ধর্মঠাকুরের থান ই বেশী।
আটন তার।
প্রতি বছর ১৩ ই বৈশাখ কালুবীরের পূজা। ডোম রা করেন। মনে পড়ছে নিশ্চয় ই। ধর্ম্মমঙ্গল কাব্যের বীর কালু ডোমের কথা।
কালু কে না পেলে তো লাউসেনের জেতা হতনা।
লাউসেন তলা এখন ও রয়েছে। আছে অনেক গাছপালা। শ্যাওড়া তো আছেই।
এই লাউসেন তলাতেই মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল
ইছাই ঘোষের সাথে লাউসেন এর। বৃদ্ধ ইছাই হেরেছিলেন। মরেছিলেন।
দু পক্ষের মারাত্মক যুদ্ধে বহু সৈন্য কে মরতে হয়েছিল রক্ত গড়িয়ে গিয়েছিল
' রক্তনালা' দিয়ে।
কালু বীর ও মারা গিয়েছিল। তাঁর স্মৃতি তে জয়দেব কেন্দুলি র কাছে সুগড় গ্রামের ডোম সম্প্রদায় এর মানুষজন; যাঁরা নিজেদের কালুর বংশধর মনে করেন; তাঁরা ১৩ ই বৈশাখ তাঁর স্মৃতি তে পূজা করেন আমাদের এই জংগল মহলে এই সেনপাহারী পরগনায় সব আঁকুড়ে ডোমরা নানা থানে তাঁর পুজো করেন।
আর একটা বিষয় ঐ ১৩ ই বৈশাখ গ্রামের
মানুষ জন একটি ছোট শ্যাওড়া ডাল ঘরের চালে গুঁজে দেন। ঘরে বাজ পড়বেনা - এই বিশ্বাস।
শ্যাওড়া র সাথে আগুন এর কোন সম্পর্ক আছে নাকি।
শুকনো দুটো ডালে ঘষে আগুন ধরাতে এক বৃদ্ধ আদিবাসী মানুষ কে দেখেছিলাম।সেই কোন ছেলে বেলায়।
একটা ছোট্ট টুকরোর মধ্যে গর্ত।আর সেই গর্তের ভিতর আর একটা টুকরো ঢুকিয়ে দড়ির টানে ঘর্ষণ তৈরী করে আগুন জ্বালানো। শোলায় সেই আগুন কে নিয়ে নেওয়া।
সেই মানুষ টি ই
বোধ হয় শেষ অগ্নিহোত্রী।
----------------
---------
এপার- ওপার
এক পা এপারে তো আরেক পা ওপারে।
মাঝে নদী। অজয়। যদিও সে নদ।
প্রতিদিনের পারাপার। একবেলা এপার ওপার না করলে মন টা যে কেমন করে।
বাজার হাট দোকান দানি গল্প গুজব রোগ অসুখ
সবেতেই এপার ওপার করতে হবেই।
সে কি আর আজকের কথা। এ চলে আসছে সেই কবে থেকে সে আর কে জানে।
অজয় পেরিয়ে ' উত্তর রাঢ়'। বজ্জভূমি।
সে কোন প্রাচীন যুগে। বক্রেশ্বর হয়ে রাঢ়িখণ্ড বা ঝাড়িখন্ডজংগলভুমি র ভিতর দিয়ে গিয়ে বৈদ্যনাথ ধাম। সব ই বীরভূম।পরেশনাথ পাহাড়ে জৈন সাধুরা তপস্যা করছেন।
মহাবীর সাধু পরিক্রমা করে গেছেন। জৈন দের কাছে তাই রাঢ় পুণ্য ভূমি।
এপারে বর্দ্ধমান তো তাঁর ই নামে। নির্গন্থপুত্র বর্দ্ধমান তো তাঁর ই অপর নাম।
এই অজয় প্রাচীনা অজি বা অজাবতী হয়তোবা ঋজুপালিকা র তীর ধরে তিনি হেঁটেছেন অনেক অনেক পথ।
সে তো অনেক কথা।
যাইহোক ১৮---- সালে বর্ধমান - বীরভূমের প্রাকৃতিক সীমানা হিসাবে অজয় কে মেনে নেওয়া হল।
ওপারে গঞ্জ ইলাম বাজার।রেশম ; কার্পাস; লাক্ষা ; নীল এর নিলাম কেন্দ্র। তা ছাড়া ধান চাল মুদিখানা সোনা রূপা র বাজার। এলেম আছে মানে ইজ্জত আছে তাই এলেমবাজার। আবার নিলাম এর বাজার। সেখান থেকেও হতে পারে।
ভরা বর্ষায় পারাপার সহজ নয়। ওপারে খয়েরবুনি র শিমূল তলার ঘাটে নৌকো বাঁধা থাকে। পারাপার করে। অন্য সময় অল্প জল।
বাঁশ কাঠ এর অস্থায়ী সাঁকো। পারাপার সহজ হয়।
কোথাও হাঁটুজল।গোরু গাড়ি পার হয়ে যায়।
বসুধার চাষি রা ধান চাল নানা সব্জী নিয়ে যায় ওপারের হাটে। এমনকি চলে যায় চৌপাহারী জংগল পার হয়ে বোলপুর এর আড়তে।
বসুধার লড়ি বা নড়ি রা লাক্ষা বা গালা বেচে আসে ইলামবাজার এর নিলামে। এপারের নদী বাঁধ ধরে অযোধ্যা বনকাটি এলাকার মানুষ জন ইলামবাজার যায়।
বারবার মাটির নদীবাঁধ ভেঙেছে। নদীবাঁধ - সে ও তো আজকের নয়। সেই কবে ১৮৪০ থেকে তৈরীর প্রস্তুতি। গৌরবাজার থেকে কাজলাডিহি। কাজলাডিহি থেকে খেড়োবাড়ি - অর্জুন বাড়ি। সাতকাহনিয়া থেকে সাগরপুতুল। বন্যার জল আটকানোর জন্য নীচু বাঁধ।
তবু বর্ষা এলেই বুক দুরুদুরু। নদী তে বান এলেই বসুধা ভয়ে রাত জাগে।বারবার ডুবেছে যে।
১৯৬২ তে অজয় সেতুর উদ্বোধন হল।
মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে।
মানুষের যাতায়াত সহজ হয়ে গেল।
অনেক কাছের হয়ে গেলো এপার ওপার।
ওপার ডাকে আয় আয়।আবার কাজ শেষে ঘরে ফেরা এপারে।
----------------------- এপার- ওপার।
------------------------ প্রণব ভট্টাচার্য।
জঙ্গলমহলের শিবপূজা
পরপৃষ্ঠা
রক্ষিত পুরের শিবের গাজন
কথিত আছে সে প্রায় চারশো বছর আগে
স্ব্ররূপ ঘোষ নামে এক ব্যক্তির গাই গোরু টি বাড়িতে দুধ দিতনা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সে দুধ দেয় একটি পাথরের মাথায়।
স্বপ্নাদেশ পেলেন যে কাশী বিশ্বনাথের ই অংশ
ইনি।তাঁকে প্রতিষ্ঠা র এবং পূজার্চনার আদেশ পেলেন। গ্রামের মানুষের সহযোগিতা য় মাটির ঘরে তাঁ্র প্রতিষ্ঠা হল।
লোহাগুড়ি গ্রামের জগবন্ধু সরকার মশাই স্বপ্নাদেশ পেয়ে অতি চমৎকার আধুনিক মন্দির বানিয়ে দিয়েছেন।
পাশাপাশি ছয় সাত টি গ্রামের মানুষ এই শিবের
গাজনে সাহায্য সহযোগিতা করেন।
কুড়ি- পঁচিশ টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ উৎসব এ অংশ গ্রহন করেন।
এখানে চরক কাঠ টি ২০-২৫ ফুট উঁচু।
দড়ি বেয়ে উঠে ভক্তারা পাক খান।
চরক কাঠ টি যে পুকুরে রাখা হয় সেখান থেকে সেটিকে আর পাওয়া যায়না।
কলকাতার দলের যাত্রাপালা সহ গান বাজনার অনুষ্ঠান হয়।
শ্রী গুরুপদ রায় এবং শ্রী তারাচরন রায় এই শিবের পুজার্চনা সহ গাজন অনুষ্ঠান টি পরিচালনা করেন।
বাঙ্গালী র মূল কিন্তু তন্ত্রে। তাই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম পাল রাজাদের রাজত্ব কালে বাঙ্গলায় যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল।এই কদিনে শিব সবার। সকলের অধিকার।সমাজ বিন্যাসের নীচের তলার মানুষ গুলি কে আবার কাছে নেওয়া হল। এঁরা ই তো সব জাতপাত হীন বৌদ্ধধর্ম এ যোগ দিয়েছিলেন।
পাল পর্বের পর বা এঁরা আবার ফিরতে বাধ্য হলেন। স্ব গোত্র ছেড়ে শিব গোত্রে নাম লেখালেন।আর শিব তো এক অসাধারণ দেবতা।তিনি সবার ই হতে পারেন।প্রাচীন ধর্ম ; ধর্মরাজ ; বুদ্ধ; শিব সবাই এই বাঙ্গলায় মিশে গেছেন।
সামাজিক প্রয়োজনেই এই মিলন মিশ্রণ।
আর বাঙ্গালীর সাধনা তো মিলন মিশ্রনের ই।
এই আমাদের ঐতিহ্য।
-----------------------------------------------
জঙ্গলমহলের শিব পূজা
শিব ঠাকুরের গাজন
-------------------প্রণব ভট্টাচার্য
কাছে দূরে ঢাক বাজছে। শিবমন্দির প্রাঙ্গণে।
গাজন আসতে আর দেরী নাই।
আমাদের এই রাঢ় বাঙলার নানা গ্রামে
চৈত্র সংক্রান্তি র শিবের গাজন একটি বৈশিষ্ট্য পূর্ণ লোকায়ত উৎসব।
আমাদের এই এলাকার অর্থাৎ থানা - কাঁকসা ; প: বর্ধমান জেলার অন্তর্গত বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এবং সংলগ্ন একটি গ্রামের গাজন উৎসব নিয়ে একটু আলোচনা করব।
তার আগে সংক্ষেপে একটু ইতিহাস বলে নিই।
হয়তো জানেন ; আউশগ্রাম এবং কাঁকসা থানা এলাকার জংগল ভূমি নিয়েই বর্ধমানের জংগল মহল। প্রাচীন গোপভূম। পরগণা - সেনপাহাড়ী।
এখানে ই বিখ্যাত ' গড় - জংগল '।
এই সেই ধর্ম্মমঙ্গল খ্যাত ইছাই ঘোষের প্রাচীন রাজত্বভূমি। জংগলের মধ্যে ছিল গড়। মোটামুটি
হাজার বছর আগের কথা। গড় নাই। ধংসাবশেষ আছে।আছেন গড়ের দেবী শ্যামারূপা।
আর আছে ইছাই এর স্মৃতি জড়িত স্থানে অবস্থিত
বিখ্যাত পুরাকীর্তি ' ইছাই ঘোষের দেউল'।
সীমান্ত এলাকা। উত্তরে অজয়।ওপারে বীরভূম।
জয়দেব - কেন্দুলি। গঞ্জ - ইলামবাজার।
তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান বীরভূম।
বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ১৬ টি মৌজা। ২২-২৩ টি গ্রাম। লোক সংখ্যা আনু-২০-২১ হাজার।
মোট শিবমন্দির ৩০ টি। ভগ্ন সমেত।
বসুধা প্রাচীন গ্রাম।বেশ কয়েকটি শিব মন্দির
ধ্বংস হয়ে গেছে।এখন রয়েছে একটি বেশ বড় সহ তিনটি ছোট মন্দির।
রঘুনাথপুর গ্রামে রয়েছে টি মন্দির।
অযোধ্যা- বনকাটি এই এলাকার কেন্দ্রভূমি।পুরোনো দিনের গঞ্জ। সমৃদ্ধ গ্রাম।
এখানেই রয়েছে ১৯-২০ টি শিবমন্দির। সব ই পারিবারিক। দু টি ছাড়া।এই দুটি ই গ্রাম্য সর্বসাধারণ এর।
বনকাটির রায়বাড়ির বিখ্যাত কালীমন্দির প্রাঙ্গণে নির্মিত হয়েছিল সর্বপ্রাচীন শিবমন্দির টি।১৭০৪ শকাব্দে।
টেরাকোটা র কাজের জন্য বিখ্যাত গোপালেশ্বর শিব মন্দির টি১৭৫৪ শকাব্দে নির্মিত।
ভূগর্ভ থেকে উত্থিত অযোধ্যা গ্রামের অনাদিনাথ শিবলিঙ্গ সহ মন্দির টি ও সু প্রাচীন। এটি সর্বসাধারণ এর।
এই শিব কে কেন্দ্রকরেই শিবের গাজনের ধূম।যে ধূম ছিল তা আজ আর নেই।
মানুষের সেই উৎসাহ নেই। বহু স্তরীয় নানা
জটিলতা। নানা বিভাজন। যাই হোক তবু
হয়।
একটু দুরেই সংলগ্ন মলানদিঘী গ্রাম পঞ্চায়েতের রক্ষিত পুর প্রাচীন গ্রাম।
ইছাই ঘোষের আমলের গ্রাম। ধন দৌলত এখানে সম্ভবত রক্ষিত থাকত।
এখানের শিবের গাজন খুব ই বিখ্যাত।
শুরুতে অযোধ্যা গ্রামের অনাদি নাথ শিবের
গাজনের কথা।একটু বলি
এই শিবলিঙ্গ টির সারা বছর পূজার্চনা এবং হোম
যজ্ঞ চরক গাজন এর জন্য বর্ধমান এর রাজা রা ২৮ বিঘা জমি দান করেছিলেন। বামুন পাড়ায় পুরোহিত এবং তত্বাবধানের জন্য
বাগদী পাড়ায় গাজনের ভক্তা মুচি পাড়ার ঢাকি - সবার জন্য ই কিছু জমি বরাদ্দ হয়েছিল।
অতীতে এখানকার গাজন ছিল খুব ই বিখ্যাত।মন্দির প্রাঙ্গন পথ ঘাট একে বারে লোকে লোকারণ্যহয়ে যেত। গাজনের ভক্তাদের নাচ। বাণ ফোঁড়া অবস্থায়।
সারা অঙ্গে ই বাণ ফোড়াঁ।অষ্ট অঙ্গে।
হ্যাঁ বান ফোঁড়ার জন্য ; বাণ তৈরি র জন্য কামার দের দায়িত্ব নির্দিষ্ট ছিল।তার জন্য তাঁদেরও জমি ছিল।
দুটি গোরুগাড়িকে জুড়ে তৈরি করা হত
গাজনের ভক্তাদের গাড়ি। সামনে পিছনে
মোটা কাঠের খুঁটি মাস্তুল এর মতো শক্ত করে বাঁধা। দুই খুঁটিতে বাঁধা আনুভূমিক লম্বা বাঁশ বা কাঠ। তাতে ঝুলছে ভক্তা রা। দোল খাচ্ছে।ফুল ছূড়ছে।পা উপরে মাথা নীচে।
খুব সহজ নয়। তিন দিন চলছে উপোষ। সন্ধ্যায়সামান্য ফলজলে আর কি হয়।
যাকে বলা হয় ছোট বানামো - সেদিন থেকেই শুরু।অশৌচ পালনের মতো কোড়াাকাপড় এর বস্ত্রখণ্ড পরিধান।গলায় সেই কাপড়ের গলবস্ত্র। লোহার এক চাবি তাতে বাঁধা।
কার মৃত্যু জনিত শোক পালনের নিদর্শন?
গ্রামে গ্রামে চলে পরিক্রমা। মাথায় মনুষ্য আকৃতি র একটি মোটা কাঠের প্রতীকী এক বস্তু। গায়ে তার অনেক কাঁটা পেরেক বা মোটা জলুই গাঁথা।
এ কার মৃত দেহের প্রতীকী রূপ।
গ্রাম পরিক্রমা ; গৃহস্থ মানুষজনের কাছ থেকে
চাল ডাল আনাজ পাতি সংগ্রহ। মুখে জয় বাবা বাণেশ্বর - আওয়াজ। জয় বাবা ধর্মরাজ।
কে এই বাণ। পুরাণ এর সেই শিবভক্ত
বাণ রাজা। যাঁর নামে বাণ লিঙ্গ?
দ্বিতীয় দিন বড় বানামো। নির্জলা উপোষ সারাদিন। সন্ধ্যায় একটু ফলজল।
আবার সেই গ্রাম পরিক্রমা। বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে পরিক্রমণ। ক্লান্ত শরীর।
তৃতীয় দিন চরক। কোথাও নাগরদোলা র মতো চরকের চরকি।
চতুর্থদিন হোম ; যজ্ঞ।
বিকালে নিমপাতা বাটা মেশানো বেলের
সরবত।ভক্তা দের জন্য। রাত্রে ভোগ প্রসাদ।
গাজনের অনুষ্ঠান শেষ। ভক্তাদের পালন শেষ।
------( পরের পাতায়)
--
বীরপূজা ২
পরপৃষ্ঠা------- বীরপূজা
আমরা আলাদা। আমরা বাগ; ব্যগ্রক্ষত্রিয় - বাগদী। আমরা অনেক যুদ্ধ করেছি। হয়েছিলাম রাজা। বাগদী রাজা। বিষ্ণুপুরের রাজারা আমাদের ই লোক।
আমাদের জাত আলাদা। আমরা উঁচু।
আমরা সেন পাহারীর মুচি। আমাদের নাম শুনলে ভয়ে জান কতজনার শুকিয়ে যেত।
বলে কয়ে ডাকাতি করতাম। ছিল আমাদের বাহিনী।। আলাদা দাম ছিল তার। বিশেষ ডাক ছাড়া আমরা বেরুতাম না।
আমাদের আলাদা এলেম ছিল।
আমরাও তাই। আমরা হাঁড়ি।আমরাই তো সর্দার। আমাদের চেয়ে ওস্তাদ আর কে?
আমরা ডোম। পাঁচ টা থাক আছে আমাদের।আলাদা দাম পেয়েছিলামআমরা সেই কবে হাজার বছর আগে। আমরাই আগে যোগ দিয়েছিলাম বৌদ্ধ ধর্মে। আমরাই হয়েছিলাম পুরোহিত। হাতে ছিল তামার বালা।
আমাদের মেয়েদের ছাড়া তন্ত্র সাধনা হয়েছে না কি।
সে ছিল আমাদের এক আশ্চর্য দিন।
আমাদের ছাড়া যুদ্ধ করে কার সাধ্যি।
আগে আমি; বাগে আমি। আগে ডোম বাগে ডোম ঘোড়াডোম সাজে। আঁকুড়ে ডোম।
যূদ্ধ ই আমাদের পেশা। আমাদের চেয়ে বড় যোদ্ধা
আর কারা ছিল।
হ্যাঁ বাইরেও যেতাম। তেমন ডাক পেলে।
খাতির চাই। সে যুদ্ধ করতে ত্রিপুরা রাজাদের ডাকে গিয়েছি। আবার বড় বড় দিঘী কাটতে ও বছরের পর বছর সেখানে থেকেছি। রাজত্ব আগলেছি।
আমরা কালু ডোমের বংশধর। সেই বীর কালু।
আপনারা জানেন ধর্ম্মমংগল কাব্যে আছেন।সে সহায় না হলে কি লাউসেন পারত ইছাই ঘোষ কে হারাতে। কি শেষ করতে। লাউসেন এই এলাকার বন জংগল ; পথঘাট কিবা জানত।
আমি লোকজন নিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলাম।
ঐ অজি মানে অজয় নদী কে চেনা সহজ ব্যাপার নয়। বড় বড় নৌকো চলে। জল গভীর। জলে ঘূর্ণি। প্রবল টান।
তো লাউসেন নদী র এপারে মানে উত্তরে আমাদের গাঁ য়ের কাছেই তাঁর শিবির পাতলেন। জয়দেব কেন্দুলী র কাছেই আমাদের গাঁ। সুগড়। পরে রাজারা গড় বানিয়েছিলেন।
তো ভীষণ যুদ্ধ হল। কত সৈন্য যে মারা গেল।
রক্তগঙ্গা বইল। ' রক্তনালা' দিয়ে সে রক্ত গড়িয়ে গেল। নদী পেরিয়ে যারা গিয়েছিল তারা আর কেউ ফেরেনি। ঐ' কাঁদুনে ডাঙ্গা' তেই সব শেষ। গড় পর্যন্ত
আর কাউকে পৌঁছতে হয়নি।
ইছাই এর গড়। সে দারুন শক্ত পোক্ত গড়।
মোটা মোটা পরপর মাটির ; ইঁটের তিনটে পাঁচির। ভেতরে ঢুকি সাধ্য কার।
ভিতরে ' ঢেকুর গড়'। কামারদের তৈরী। ঐ ঢোকরা কামার। যেমন ধারালো তাদের অস্ত্র।
লোহাগুড়ি তে তাদের প্রধান আস্তানা।
ইছাই এর গড় ভেদ করা সোজা নয়।
তারপর ইছাই তন্ত্রবলে বলীয়ান। তাঁর আরাধ্যা দেবী' শ্যামারূপা'। তাঁর বর আছে।
-------------- পরপৃষ্ঠায়
Subscribe to:
Posts (Atom)