Friday, 8 June 2018
অযোধ্যা - বনকাটি এলাকার কালী পূজা
( পরগণা - সেনপাহাড়ী ; জঙ্গল মহল ; বর্দ্ধমান ; বর্তমানের থানা - কাঁকসা )
প্রণব ভট্টাচার্য
জঙ্গল মানেই অন্ধকার। অন্ধকার মানেই ভয়।
যেখানে অন্ধকার যেখানে ভয় সেখানে ই
কালীপুজো।
সে কয়লা খনি হোক আর থানা ই হোক।
আর তমসার দেবীর পুজো না করে আর ডাকাত রা কবে রণে গিয়েছে। কালী শক্তি দায়িনী।
আর জঙ্গল মহল। চির বিদ্রোহী। মানে চির উপদ্রুত। তকমা ও তেমন। অপরাধ প্রবণ। সরকার বাহাদুর এর সুতীক্ষ্ণ নজর।
হলে কি হবে। চুরি ডাকাতি প্রায় প্রতি দিনে রাতে। সাতকাটার জংগলে দিনে ই কেটে দিচ্ছে। সেনপাহাড়ীর মুচি দের কথা কে না জানে। যেমন লম্বা চওড়া দেখতে।
তেমনি দুর্ধর্ষ। নাম করা সব ডাকাত।
ওদিকে জংগল এর গায়ে গায়ে গাঁ গুলো - জামডোবা - চুয়া - রক্ষিতপুর -
লোহাগুড়ি - হরিকি - মলান দিঘি
এই একটা বেল্ট। সব গাঁ য়েই ওস্তাদ রা আছে। এদের ও এলাকা ভাগ আছে।
অবশ্য ভাড়া যেতে খুব আপত্তি নেই।
যায় ও। ওদিকে কাঁটাবেড়ে র সৌ দের মদ শালে দেখা সাক্ষাত হয় বাবুদের।
শিবপুর - জামবন - বিষ্টুপুর- জাঠগড়ে র সব মাল। ওদিকের গ্রুপ টার মানে বিজড়া - শোভাপুর - ধবনি লবনাপারা - আকন্দারা ওয়ালাদের সাথে খবরাখবর চালাচালি হয়।
সৌ শুনে ও না শোনার ভান করে।
আর খুব বড় ওস্তাদ রাজহাট এর হাঁড়ি দের কর্তার সাথে ও কথা হয়।
কেউ কারো এরিয়ায় ঢোকেনা। বাঁটুল থেকে গুলি পাথর ছুঁড়ে জানান দেয়।
জামডোবা র মুচি দের ডাকাতে কালী ।
সাধন পুজন করেন ব্রহ্মচারী কালীশংকর রায়। পরে এই পুজো ই এলো অযোধ্যা গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারে।
অযোধ্যা র মুচি দের বিরাট কালী।
সর্দার দের পাড়া।
বনকাটি র মুচি দের পুজো ও জাঁকালো।
এছাড়া ডোম দের আছে। বাউড়ী দের ও।
বাগদী দের ও।
ভূস্বামী পরিবার গুলির মধ্যে বনকাটি রায় পরিবারের কালী পুজো খুবই পুরোনো।
তান্ত্রিকমতে পূজা হয়।
মুচিরা ছিল রায় দের লেঠেল। বশংবদ।
তাদের আনুগত্য ধরে রাখতে রায় দের কালী র সাথে মুচিদের দুই কালীর হল বোন সম্পর্ক।
অযোধ্যা - সাতকাহনিয়ার বাউরী সমাজের সম্পর্ক আছে ভালই।
তাদের ও পুজো আছে। দু গাঁয়ের দু পাড়াতেই। সব এক রাতের কালী।
তিমির নাশিনী - তমসার দেবী। তালপাতার কুঁড়েতে তাঁর অধিষ্ঠান হয়।
সে হোত একসময়। এখন সব পাকা মন্দির। জাঁকজমক। মহোৎসব।
এই জঙ্গল মহলের কোন গ্রামে আর কালীপুজো না হয়। বিরাট বিরাট কালীমূর্তি । জামদহ ; রাজ হাট; নবগ্রাম বিদবিহার ;বিনোদপুর; প্রভৃতি গ্রামে। গ্রামগুলি বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার। আমাদের আজকের আলোচ্য
নয়। অন্যসময় হবে।
আমাদের বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অযোধ্যা - বনকাটি গ্রাম ছাড়া ও অন্যান্য গ্রাম গুলিতেও অনেক কালী পুজো।
সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ স্তরের মানুষেরাই এই পুজোর আয়োজক। পুজো তাঁরা নিজেরাই করেন।
বাংলায় তো এরাই যোদ্ধৃ জাতি। ডোম ; হাঁড়ি; মুচি ; বাগদী ; মাল ; বাউরী ; এরাই তো যুদ্ধ করেছে। ডোম সৈন্য রা তো খুব ই বিখ্যাত ছিল। বাইরেও যুদ্ধ করতে গেছে।
আবার ডাকাতি ও করেছে। কোন স্থানীয় রাজা র পরাজয় এর পর সৈন্য দল ভেঙ্গে গেছে। সৈনিকের মর্যাদা চলে গেছে।অনেকে চাষবাসে আর ফিরতে পারেনি।
ডাকাতি তে চলে গেছে।সামাজিক দূরবস্থাও অন্যতম কারন।
অন্ধকারের দেবী র কাছে শক্তি প্রার্থনা করেছে। লড়াই এর শক্তি ; আত্মবিশ্বাস।
আদিবাসী সাঁও তাল রাও কালী পুজো করে।
মহিষাসুর কে যেমন তারা তাদের পুর্বপুরুষ নেতা বলে মনে করে - । কালী কি তাদের ঘরের মেয়ে। একদিন কি তার ই নেতৃত্বে উগ্রচণ্ডা নারী বাহিনী তাদের রক্ষার জন্য লড়াই এ নেমেছে। গলার নরমুণ্ড মালার সাদা হলুদ রঙের মাথাগুলি কাদের?
ইতিহাস কি বলে?
অমানিশা র দেবীর পূজা
অযোধ্যা - বনকাটি এলাকার কালী পূজা
( পরগণা - সেনপাহাড়ী ; জঙ্গল মহল ; বর্দ্ধমান ; বর্তমানের থানা - কাঁকসা )
প্রণব ভট্টাচার্য
জঙ্গল মানেই অন্ধকার। অন্ধকার মানেই ভয়।
যেখানে অন্ধকার যেখানে ভয় সেখানে ই
কালীপুজো।
সে কয়লা খনি হোক আর থানা ই হোক।
আর তমসার দেবীর পুজো না করে আর ডাকাত রা কবে রণে গিয়েছে। কালী শক্তি দায়িনী।
আর জঙ্গল মহল। চির বিদ্রোহী। মানে চির উপদ্রুত। তকমা ও তেমন। অপরাধ প্রবণ। সরকার বাহাদুর এর সুতীক্ষ্ণ নজর।
হলে কি হবে। চুরি ডাকাতি প্রায় প্রতি দিনে রাতে। সাতকাটার জংগলে দিনে ই কেটে দিচ্ছে। সেনপাহাড়ীর মুচি দের কথা কে না জানে। যেমন লম্বা চওড়া দেখতে।
তেমনি দুর্ধর্ষ। নাম করা সব ডাকাত।
ওদিকে জংগল এর গায়ে গায়ে গাঁ গুলো - জামডোবা - চুয়া - রক্ষিতপুর -
লোহাগুড়ি - হরিকি - মলান দিঘি
এই একটা বেল্ট। সব গাঁ য়েই ওস্তাদ রা আছে। এদের ও এলাকা ভাগ আছে।
অবশ্য ভাড়া যেতে খুব আপত্তি নেই।
যায় ও। ওদিকে কাঁটাবেড়ে র সৌ দের মদ শালে দেখা সাক্ষাত হয় বাবুদের।
শিবপুর - জামবন - বিষ্টুপুর- জাঠগড়ে র সব মাল। ওদিকের গ্রুপ টার মানে বিজড়া - শোভাপুর - ধবনি লবনাপারা - আকন্দারা ওয়ালাদের সাথে খবরাখবর চালাচালি হয়।
সৌ শুনে ও না শোনার ভান করে।
আর খুব বড় ওস্তাদ রাজহাট এর হাঁড়ি দের কর্তার সাথে ও কথা হয়।
কেউ কারো এরিয়ায় ঢোকেনা। বাঁটুল থেকে গুলি পাথর ছুঁড়ে জানান দেয়।
জামডোবা র মুচি দের ডাকাতে কালী ।
সাধন পুজন করেন ব্রহ্মচারী কালীশংকর রায়। পরে এই পুজো ই এলো অযোধ্যা গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারে।
অযোধ্যা র মুচি দের বিরাট কালী।
সর্দার দের পাড়া।
বনকাটি র মুচি দের পুজো ও জাঁকালো।
এছাড়া ডোম দের আছে। বাউড়ী দের ও।
বাগদী দের ও।
ভূস্বামী পরিবার গুলির মধ্যে বনকাটি রায় পরিবারের কালী পুজো খুবই পুরোনো।
তান্ত্রিকমতে পূজা হয়।
মুচিরা ছিল রায় দের লেঠেল। বশংবদ।
তাদের আনুগত্য ধরে রাখতে রায় দের কালী র সাথে মুচিদের দুই কালীর হল বোন সম্পর্ক।
অযোধ্যা - সাতকাহনিয়ার বাউরী সমাজের সম্পর্ক আছে ভালই।
তাদের ও পুজো আছে। দু গাঁয়ের দু পাড়াতেই। সব এক রাতের কালী।
তিমির নাশিনী - তমসার দেবী। তালপাতার কুঁড়েতে তাঁর অধিষ্ঠান হয়।
সে হোত একসময়। এখন সব পাকা মন্দির। জাঁকজমক। মহোৎসব।
এই জঙ্গল মহলের কোন গ্রামে আর কালীপুজো না হয়। বিরাট বিরাট কালীমূর্তি । জামদহ ; রাজ হাট; নবগ্রাম বিদবিহার ;বিনোদপুর; প্রভৃতি গ্রামে। গ্রামগুলি বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার। আমাদের আজকের আলোচ্য
নয়। অন্যসময় হবে।
আমাদের বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অযোধ্যা - বনকাটি গ্রাম ছাড়া ও অন্যান্য গ্রাম গুলিতেও অনেক কালী পুজো।
সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ স্তরের মানুষেরাই এই পুজোর আয়োজক। পুজো তাঁরা নিজেরাই করেন।
বাংলায় তো এরাই যোদ্ধৃ জাতি। ডোম ; হাঁড়ি; মুচি ; বাগদী ; মাল ; বাউরী ; এরাই তো যুদ্ধ করেছে। ডোম সৈন্য রা তো খুব ই বিখ্যাত ছিল। বাইরেও যুদ্ধ করতে গেছে।
আবার ডাকাতি ও করেছে। কোন স্থানীয় রাজা র পরাজয় এর পর সৈন্য দল ভেঙ্গে গেছে। সৈনিকের মর্যাদা চলে গেছে।অনেকে চাষবাসে আর ফিরতে পারেনি।
ডাকাতি তে চলে গেছে।সামাজিক দূরবস্থাও অন্যতম কারন।
অন্ধকারের দেবী র কাছে শক্তি প্রার্থনা করেছে। লড়াই এর শক্তি ; আত্মবিশ্বাস।
আদিবাসী সাঁও তাল রাও কালী পুজো করে।
মহিষাসুর কে যেমন তারা তাদের পুর্বপুরুষ নেতা বলে মনে করে - । কালী কি তাদের ঘরের মেয়ে। একদিন কি তার ই নেতৃত্বে উগ্রচণ্ডা নারী বাহিনী তাদের রক্ষার জন্য লড়াই এ নেমেছে। গলার নরমুণ্ড মালার সাদা হলুদ রঙের মাথাগুলি কাদের?
ইতিহাস কি বলে?
মন্দিরময় অয্যোধ্যা - বনকাটি
প্রাচীন সেই বনকাটি
------------- প্রণব ভট্টাচার্য
১৭০৪ শকাব্দ। মানে ১৭০৪+৭৮ = ১৭৮২ সাল। মানে আজ থেকে ২৩৫-৩৬ বছর আগে এখানকার মানে এই এলাকার প্রথম শিবমন্দির টি তৈরি হচ্ছে বনকাটি গ্রামে : থানা - কাঁকসা প: বর্ধমান। বিখ্যাত রায় বাড়ির কালীবাড়ি র প্রাঙ্গণে।
পাশাপাশি দুটি চারচালা মন্দির। হয়তো ছোট।
টেরাকোটা র কাজের বিস্তৃত অলংকরণ নাই।
উত্তর মুখী। শিবলিঙ্গ ও তাই। দিক নির্দেশক ও বটে।
এরপর ৫২ বছর পর নির্মিত হচ্ছে একই প্রাঙ্গণে
পূর্বমুখী তিনটি বেশ বড়ো পীড়যুক্ত শিবমন্দির।
স্বল্প টেরাকোটা র কাজ। কিন্তু ভালো।
মন্দিরের পিছন দিক সাধারণত অলংকৃত হয়না।
কিন্তু এখানে পঙ্খএর প্লাস্টার এর উপর চমৎকার
লতাপাতার ফ্রেস্কোর কাজ। রংতুলি তে আঁকা। কি ডিজাইন! আহা!
প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। যেটুকু বোঝা যায়- - এখানে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে
মিস্ত্রী কারা। তাদের নাম জানার কোন
উপায় নেই।
ডিজাইনে মিল থাকেই। এই এলাকার অন্যান্য কয়েকটি মন্দির এরকাজের সাথে মিল আছে। মনে হয় মিস্ত্রী
একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। ঘরানার মিল।
অর্থনৈতিক অবস্থা র উন্নতি ঘটল।
সেই সময় টাকে ঠিক ঠাক বুঝতে চাইছি- সামগ্রিক ভাবে।
Friday, 1 June 2018
বীর কালু এবং নদীর এপারওপার
আজ ১৩ ই বৈশাখ। ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। ইংরাজি ২০১৮ সাল।
দ্বাদশী তিথি।
সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। সেই অসহ্য গুমোট গরম টা নেই।
নদী র ওপারে ঢাক ঢোলের আওয়াজ এপারে আসছে। আর এপারের আওয়াজ ওপারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
অজয়ের ওপারে ' লাউসেন তলা'। 'লাউসেন গোড়ে'। গাছপালা ঝোপঝাড়ে ভর্তি জায়গা।
আজ সেখানে বহু মানুষের জমায়েত।
মহা উৎসাহে ; বিরাট ধূমধামের সাথে সেখানে
আজ পূজা হচ্ছে ' কালুবীর' এর।
বাইরে থেকে আঁকুড়ে ডোম সম্প্রদায় এর
শিক্ষিত মানুষেরা ও অনেকে এসেছেন।
স্থানীয় আঁকুড়ে ডোম সম্প্রদায়ের মানুষেরা এসেছেন দলে দলে।
জয়দেব - কেন্দুলী র কাছেই প্রাচীন ' সুগড়'
গ্রাম। সেখানের ডোম সম্প্রদায়ের মানুষেরাও
আজ তাঁর পূজা করছেন। যথারীতি নিজস্ব আচার অনুষ্ঠান অনুযায়ী। শেষ পর্বে ছাগ বলি রীতি।
অজয়ের এপারে দক্ষিণ তীরে দুবরাজপুর মানা র উত্তরে নদী বাঁধ এর গায়েই ' বুধো রায়' এর থান। নামটি লক্ষ্য করুন। বুধো রায়।
আদিতে ইনি বুদ্ধ রায়। বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েত। বিদবিহার নাম তো বৌদ্ধবিহার এর অপভ্রংশ। সেই পাল যুগে অজয়ের এপার ওপার দুপারেই তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের দারুন প্রসার প্রভাব। ডোম সম্প্রদায় সহ সমাজের
অন্ত্যজ শ্রেণী র মানুষেরা এই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে দারুন ভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
প্রথমত জাতপাত হীন এই ধর্মে তাঁরা বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন। সমাজে বেড়েছিল তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি।
ডোম্ব - ডোম্বীনি দের নানা কথা তো চর্যাপদে
আমরা পাচ্ছিই। নাচে গানে তাঁরা পারদর্শী।
আর ' দেহভাণ্ড ই ব্রহ্মাণ্ড '। দেহসুখেই - চিত্তসুখের সন্ধান। আর সে দেহ সাধনা তো আর ডোমনী দের ছাড়া হয় না। দেহ নিয়ে
অত শুচিবাই গ্রস্ততা তাদের নেই।
যাই হোক একটু সরে গেছি আমাদের বিষয় থেকে।
এই বুধোরায়ের তলাতে একদিন বহু বহু গ্রামের শত শত বাজুনে ডোম সম্প্রদায়ের
মানুষেরা জড়ো হতেন এই ' কালু বীর' এর
পুজায়।এঁরা ও ডোম সম্প্রদায় এর। তবে এঁরা বৃত্তিগত ভাবে ঢাক ঢোল এর বাজনদার।
আর আঁকুড়ে রা নিজেদের পুরোনো সৈনিকবৃত্তি র কথা ভেবে গর্ব অনুভব করেন।
উভয় থাকের মানুষেরা কালুবীর কে নিজেদের বলেই মনে করেন।
এবার প্রশ্ন কে এই' কালু বীর'?
এঁকে আমরা পাব ধর্ম্মমঙ্গল কাব্যে।ময়ূর ভট্ট;
ঘণরাম; রূপরাম চক্রবর্তী ; মাণিক গাঙ্গুলী সকলের কাব্যেই তাঁকে পাই।
জাতি তে ডোম। পেশা য় সৈনিক। মারাত্মক যোদ্ধা। স্ত্রী সাহসিনী লক্ষা। সে ও যুদ্ধ জানে।
ইছাই ঘোষের সাথে লাউসেন এর যুদ্ধে
লাউসেন এর অন্যতম সেনাপতি কালু বীর।
তার সাহসে ভর করেই লাউসেন এর যুদ্ধযাত্রা। যুদ্ধবিগ্রহ ; অস্ত্রচর্চা ছাড়া আর কিছুতেই তার মন নাই। মদ্য ; মাংস ছাড়া তার চলেনা। " দেবদেবে মোর কিবা কাজ/ মদ্য মাংস না পেলে পড়ে বাজ"।
আর ডোম মানে ই তো যুদ্ধের জাত। সে যেখানের ই হোক। ' তুপুস পুরের হোক
আর ' সেন পাহাড়ী র ই হোক । ডোম সৈন্য দল মানেই সে ভয়ংকর। আর যুদ্ধযাত্রা মানেই
" আগে ডোম বাগে ডোম ঘোড়া ডোম সাজে"
কাহিনী তো মোটামুটি আমরা জানি।
তবু সংক্ষেপে না হয় আবার শুনি।
অজয়ের ওপারে গড় জঙ্গল। শ্যামারূপার গড়।ছিল পরিখা ঘেরা গড় বাড়ী। সীমান্ত প্রহরার জন্য। তখন গৌড়ে পাল রাজাদের
রাজত্ব।
তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে দূর্গ সামলান ময়না গড়ের অধিপতি কর্ণসেন।
স্থানীয় গোপ বীর ইছাই ঘোষ অতর্কিত আক্রমনে দুর্গ দখল করে নেন। কর্ণসেন
পালান। সেই আক্রমনে কর্ণসেনের ছয় পুত্র
নিহত হন। স্ত্রী আত্মঘাতিনী হন।
বিবাগী কর্ণসেন কে সংসারে ফেরাতে পালরাজ তাঁর শ্যালিকা রঞ্জাবতী র সাথে
কর্ণসেনের বিয়ে দেন। এটা না কি শ্যালক মন্ত্রী
মহামদ ভালো মনে নেন নি।
কর্ণসেন রঞ্জাবতী র ই সন্তান লাউসেন বা লব বা নবসেন।ধর্ম ঠাকুরের দয়ায় তাঁদের সন্তান
লাভ।
যুবক লাউসেন অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন।তাঁর মনে জাগল পিতার হারানো
রাজত্ব উদ্ধার। পিতার অপমান মায়ের আত্মহত্যা ভাইদের মৃত্যু তাকে অস্থির করে
তুলল। মামা মহামদ প্রবল ভাবে উৎসাহ দিলেন। তাঁর মনে কিন্তু অন্য কথা।
কালুবীর ; বিশাল সৈন্য দল ; নিয়ে লাউসেন
এসে উপস্থিত হলেন অজয়ের উত্তরে। ঘাঁটি গাড়লেন সুগড়; সন্তোষপুর এ।
তারপর অপেক্ষা। দিন ক্ষণ সময় বুঝে নদী পেরুনো। ইছাই এর ঢেকুর গড় বা ত্রিষষ্টি গড়
আক্রমন। ইছাই এতো দিনে প্রায় বৃদ্ধ। কত টা
কি পারবে- দেখা যাবে।
সেদিন শণিবার। সপ্তমী। ১৩ ই বৈশাখ।
লাউসেন গোড়ে ( ছোট্ট পুকুর) তে স্নান করে ধর্মঠাকুর এর পূজা করে লাউসেন চললেন
নদী পার হতে। সামনে তাঁর সেনাপতি কালুবীর। কালু র হু হুঙ্কারে কাঁপছে বন জঙ্গল।
ওদিকে ইছাই এর সৈন্যদল ও তৈরী।
ঘণ কাঁটাবাঁশের মোটা মোটা ঝাড় দিয়ে ঘেরা গড়।প্রাকার পরিখা ও আছে।
সমস্ত উঁচু ঢিবি গুলোর উপরে ইছাই এর
বাউড়ি ; হাঁড়ি; বাগদী ; খাঁড়াত ; কোটাল ডোম
সৈন্য রা তৈরি তীর ধনু টেঁটি খাঁড়া বল্লম
ইত্যাদি অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে।
নদী পেরুচ্ছে লাউসেন এর সৈন্য রা।
কাঁদুনে ডাঙ্গায় বাধল মারাত্মক যুদ্ধ। রক্তে ভেসে গেল " রক্তনালা"। কালু বীর বীরবিক্রমে লড়াই চালাচ্ছে।
এদিকে ইছাই এর তো নিষেধ ই ছিল " সম্মুখে সপ্তমী শণিবার বারবেলা / আজি রণে যেওনারে ইছাই গোয়ালা"। দেবী শ্যামারূপার
দৈববাণী।
কিন্তু উপায় ও নাই। লাউসেন তারস্বরে আহ্বান জানাচ্ছে বেরিয়ে আয় - আমার সঙ্গে মুখোমুখি লড়। যেতেই হল। আর উপাই বা কি।
ঐ লাউসেন তলাতেই নাকি হয়েছিল মুখোমুখি দুজনের যুদ্ধ। বৃদ্ধ ইছাই পরাজিত এবং নিহত হলেন।
ইছাই এর কাছে হারানো গড় পুনরায় দখল করলেন লাউসেন।
জয় হল ধর্মঠাকুরের।
সংক্ষেপে এই হল কাহিনী।
এবার এরমধ্যে যেটুকু ইতিহাস।
পালবংশে ই নবসেন নামে একজন কে খুঁজে
পাওয়া গেছে। তিনিই লাউসেন।
কেউ কেউ আবার বলছেন কালুবীর ; কালু সেন। তিনি নাকি লাউসেন এর ই বৈমাত্রেয় ভাই।
লক্ষী বা লক্ষা নামের ডোম সম্প্রদায়ের মেয়েকে বিয়ে করেই তিনি এলাকার সব খবরা খবর জোগাড় করেন। যা যুদ্ধ জিততে
কাজে লেগেছিল। কালু হয়ে ওঠেন ডোম সম্প্রদায়ের নেতা। কালুর স্মৃতি আজও বহমান। ইছাই বা লাউসেন এর স্মৃতি তে
পুজা হয়না। কোন জমায়েত ও না।
ডোম সম্প্রদায় কিন্তু বংশ পরম্পরা য় কালুবীর
এর পূজা করে আসছেন। যথাসাধ্য আয়োজনে।ইতিহাস বেঁচে থাকে এই লোক সাধারনের মধ্যেই।
এই আমাদের কালু বীর। নদী র ওপারের অর্থাৎ বীরভূমের দিকে র নদী তীরবর্তী গ্রাম গুলির আঁকুড়ে বা অখিরা পদবী র ডোম সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিজেদেরকে কালু র বংশধর বলে পরিচয় দেন।
আর ইছাই কে আমরা ইতিহাসে পাব ঈশ্বরী ঘোষ নামে। তিনি ' মহা মাণ্ডলিক ' রাঢ়াধীপ' ত্রিষষ্টি গড়ের অধিপতি।
বর্তমান বাংলা দেশের রামগঞ্জে প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে তাঁর কথা জানতে পারি।
মোটামুটি হাজার বছর আগের কথা।
ইছাই এর স্মৃতি বিজড়িত জায়গা য় অনেক অনেক পরে একটি দেউল নির্মিত হয়।
সম্ভবত বর্ধমান এর রাজ বংশের রাজা
চিত্রসেন এটি নির্মাণ করান।
এটি ইছাই ঘোষের দেউল নামেই বিখ্যাত।
নদীর ওপারে এই সময়ে নির্মিত হয়েছে; বা হচ্ছে লাউসেন তলায় আটন পাট মন্দির।
কালুবীরএর স্মৃতিতে এবং ধর্মরাজ পূজার
জন্য।
এসব করছেন একদল আধুনিক ভক্ত।
ডোম সম্প্রদায়ের আঁকুড়ে বা অখিরা পদবীর
একদল শিক্ষিত মানুষ এর মূল উদ্যোক্তা।
মনে হয় তাঁরা ' বীরপূজা' র এক icon কে
কালুবীর এর মাঝে খুঁজে পেয়েছেন।
ইছাই এর বিরুদ্ধে প্রবলপরাক্রমে যুদ্ধ করলেও কালু ও এই যুদ্ধে নিহত হন।
তাঁর স্ত্রী লক্ষা বা লক্ষী নিশ্চয় ই এখানে নিজেদের লোকদের সাথে থেকে যান।
প্রশ্ন জাগে কালু কি এখানের এই মাটির মানুষ।না কি লাউসেন এর সাথে বাইরে থেকে এসেছিলেন।যদি স্থানীয় মানুষ হন - তবে তাঁর মতো বীর যোদ্ধা কে ইছাই তাঁর সৈন্যদল এর
অন্তর্ভুক্ত করলেন না কেন। কেন কালু যোগ
দিলেন লাউসেন এর পক্ষে।
সে যাই হোক রাঙ্গামাটি র এই রাঢ়দেশের
এক অনন্য চরিত্র কালুডোম ; কালুবীর। ডোম সমাজের মাথার মণি-। ধর্মরাজ থানে তাঁর ও আটন। তিনি কালু রায় ও।
------+-+--------------------++----------------------------
১৩ ই বৈশাখ: কালু বীরের পূজা
--------------------------------- প্রণব ভট্টাচার্য।
Saturday, 19 May 2018
সিংহ দরজা
সিং দরজা
----------------- প্রণব ভট্টাচার্য
অনেক জমি জায়গার মালিক সম্পন্ন গ্রামীণ গৃহস্থ
পরিবার গুলির গৃহসমষ্টির মূল দরজা দেখেই বোঝা যেত তাদের আভিজাত্য।
রাজবাড়ি র সিংহদুয়ার ই তাঁদের প্রেরণা।
রাজা না হোক ছোট ;বড় ;মাঝারি ;জমিদার তো বটে। মনে তো গর্ব আছেই। হ্যাঁ - মেজাজ টা ও।
তাই ঠাকুর দালান ; ঘরবাড়ি সমেত সীমানা প্রাচীরের মাঝামাঝি সিংদরজা।
পশুরাজ সিংহ। সর্বময় কর্তৃত্ব তার। দরজার উপরে দুপাশে তার মূর্তি না থাকলে কি নিজেদের চেনানো যায়!
অন্যরকম ও যে হতনা তা নয়।
মূল পরিবার ভাঙতে ভাঙতে ; জমি জায়গা হারাতে হারাতে সেই সব পরিবার গুলির এখন জীর্ণ দশা।
পুরোনো স্মৃতি ই সম্বল।
ঐ দরজার দিকে তাকালে - অনেক কিছুই মনে ভিড় করে আসে তো বটে ই।
-------------------_-------------------------------
এক ই খিদে
বড় দুর্দশা এদের
-----------------------প্রণব ভট্টাচার্য
এদেশে মহাবীর হনুমান জী র মন্দিরের বোধ হয় অভাব নেই। যদি বা এখানে ওখানে ফাঁক ফোকর থেকে থাকে তা আশা করি সামনের বছর গুলিতে
ঠিক ই ভরে যাবে।
এদিকে জ্যান্ত হনুমান গুলির কি দশা -
কি চরম খাদ্যাভাবে এরা ভুগছে।
সংখ্যায় বেড়েছে প্রচুর।
তাদের বাসা প্রাচীন বৃক্ষ গুলি প্রায় নেই ই।
প্রাচীন গাছপালা সব কেটে ফাঁক। জংগল ভুমি
তে আম জাম পিয়াল মহুয়া হরিতকি বহেরা ইত্যাদি ফল পাকুরের গাছ আর নাই।
নাই সে অনেক দিন ই।
এর মাঝে বন বিভাগ বিদেশ থেকে শিক্ষা গ্রহন
করে সরকার পঞ্চায়েত এর মাধ্যমে ব্যাপক বন সৃজন করেছেন। লাগিয়েছেন ইউক্যালিপটাস আর
( আহা) সাধের সোনাঝুরি।
এদের ফুল পাতা কিছুই খাওয়া যায় না।
আর চাষি দের তো চাষ ছেড়ে দেওয়ার
মতো অবস্থা। মাঠে সব্জী ও নেই।
যে দু চারটে ছিঁড়ে খাওয়া যায়।
নিম পাতা শিরীষ পাতা কি কাঞ্চন পাতা
তাও মিলছেনা।
কি ম্লান মুখে হেথা হোথা ছড়িয়ে বসে রয়েছে
ওরা।
মুখের অভিব্যক্তি যেন অসহায় ভাবে বলছে
মানুষ তোমরা আমাদের জন্য কিছু কর। মরে
যাচ্ছি যে।
অসহায় অবস্থায় মনুষ্যেতর জীবেরা মানুষের ই সাহায্য চায় কিন্তু।
খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে যাচ্ছে। ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষ কে জ্বালাতন করছে। প্রবল লাফালাফি করছে। ঘরদোর এর অবস্থা খারাপ করে দিচ্ছে।
সব ই ঠিক।
কিন্তু মূল কারন খাদ্যাভাব।
আমি আর কি করতে পারি। কষ্ট পাচ্ছি।
এদের জন্য ভাববার মতো যদি কেউ
থেকে থাকেন তাঁদের কাছে আমার এই লেখাটা
যদি-
যদি পৌঁছাত।
-- ----+------------+----------
এক ই কষ্ট
এদের কষ্ট কে যে বোঝে
-------------------- প্রণব ভট্টাচার্য
এই সময় কালের মধ্যে আমাদের গাঁ ঘরের বাড়ি ঘর দোরের চেহারা অনেক বদলে গিয়েছ। বদল স্বাভাবিক। আর তা মানতেও হবে। কিন্তু- -
চাষবাস করে বেঁচে থাকা গাঁ য়ের মানুষ দের গোয়াল ঘর ছিল। গোয়াল ঘরের পিছনে দিনের বেলায় গোরু ছাগল দের বেঁধে রাখার জন্য ছিল গোয়াল চালা।
বর্ষা বাদলে বা শীতের রাতে সেখানেই
আশ্রয় নিত কুকুর ছাগল ভেড়া ইত্যাদি রা। হঠাৎ বৃষ্টি এলে পথচারী রাও মাথা গুঁজত।
গোয়ালঘর আর প্রায় নাই।পিছনের চালা তো নাই ই।
গো চারন ভূমি ও আর নাই। ঘরে বলদ পুষে চাষ আর পোষায় না। সব ট্রাক্টর দিয়েই হচ্ছে।
ঘরে বেঁধে ছাগল কে খাওয়ানো র লতা পাতা ডালপালা ই আর কোথা। চরে আর খাবে কি।
একপাল ছানা পোনা নিয়ে মা কুকুর টার করুন দশা। কোথাও জায়গা পাচ্ছেনা।
এই ঠাণ্ডা তে যে কোথায় একটু জায়গা মেলে।এদিক ওদিক করছে। ঠাঁই নাই।গাছতলাতে শুকনো পালা পাতা র উপরে
কোন রকমে গুটিসুটি। বড় জাড়।
অথচ এরাই রাত জেগে গাঁ ঘর পাহারা দেয়।
দুটো খেতেও কেউ দেয়না।
আবার জায়গা দেবে মাথা গোঁজার।
অথচ সেই মানুষ কেই ভরসা করে।
বহু বহু পুরনো বন্ধু।
সেই যে প্রথম পোষ মেনেছিল মানুষের।
কি করে ছেড়ে যায়।
--------------+-----------------+-------------
Subscribe to:
Posts (Atom)