।। গণক মামা।।
তিনি আসতেন বসুধা গ্রাম থেকে। মাঠ, ঘাট পেরিয়ে।কয়া মাঠ, কামারপাড়ার দো জমি, রূপুটে পাড়ার ভিতর দিয়ে, পায়ে হেঁটে।
পায়ের ধুলো ধুতেন আমাদের ঘরে এসে। কোন কোন দিন দুপুরের আহার এখানেই। যা জুটত। খুব তৃপ্তি করে খেতেন।
খুব সামান্য জিনিস ও আমার দিদিমার হাতের গুনে চমৎকার রান্না হয়ে যেত। সে পুঁই চচ্চড়িই হোক বা শাক পোস্ত। ছোট ছোট মাছের ঝাল। সে স্বাদ আজও যেন মুখে লেগে আছে।
হাতমুখ ধুয়ে গামছায় মুখ মুছে , মাটির ঘরের উঁচু দাওয়ার বারান্দায়
দাদুর পাশে বসতেন। একটা আসন পাতা হত। হাতে বোনা কারুকাজ করা বসার আসন। শাড়ির পাড় থেকে সুতো তুলে কি চমৎকার সব আসন বুনতেন আমাদের মা - মাসীরা।
তারও আগে দিদিমা, ঠাকুমা বা পিসিমা দের দল। দুপুর টা কাটত সেভাবেই।
আর একটা আসনের উপরে গণকমামা খুব যত্ন করে তাঁর
লাল শালুতে মোড়া পাঁজি পুঁথি খুলতেন।
দাদুর নির্দেশে তাঁর সামনে বসতে হত। তিনি মাথায় পাঁজি ঠেকিয়ে কি সব মন্ত্র বলতেন অস্ফুট স্বরে।
তারপর তার সামনে আমার ছোট্ট হাতটা পাততে হত।
তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে হাতের রেখা গুলি দেখতেন।
তারপর তাঁর যা বলার তিনি দাদুকে বলতেন। একটা কথা মনে থেকে গেছে এর বৃহস্পতির স্থান খুব ভালো। ইত্যাদি।
এই রোগা পটকা, মা মরা ছেলে টাকে নিয়ে, মায়ের বাবা দাদুর খুব চিন্তা। সে চিন্তা সর্বক্ষণের। এ ছেলে বাঁচবে তো।
কি এর ভবিষ্যৎ। কে যে দেখবে এই ছেলেকে। তাঁর ভয় তাঁদের অবর্তমানে কি গতি হবে এই ছেলের। আর যে কেউ দেখার নাই। বাবা তার আছে। কিন্তু থেকেও যে নাই।
গণক মামা দাদুর ও হাত দেখতেন। মৃত্যু রেখাটা ভালো করে দ্যাখো শম্ভু।
তারপর দাদুর সাথে গ্রহ, নক্ষত্র, তিথি, রাশি, বার এসব নিয়ে অনেক আলোচনা হত। আমি চুপ করে শুনতাম। মন দিয়ে।
তারপর আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে গিয়ে বাইরের দরজার আড়ালে নিজের হাত টাকে খুব ভালো করে দেখতাম।
এই হাতের রেখাগুলোতে লেখা আছে ভাগ্য ভবিষ্যৎ।
আকাশের গ্রহ, নক্ষত্র রা তাদের প্রভাব ফেলছে!
এই গণক মামা তাহলে আকাশের গ্রহ, নক্ষত্র গুলিকে ভালো চেনেন। মনে হত তাঁকে গিয়ে বলি, ও মামা রাতে থেকে যাও।
অন্ধকার আকাশে সব তারারা ফুটে উঠুক।
চল হালদার দের দালানে র ছাদে গিয়ে আকাশ টা কে ভালো করে দেখি। ততদিনে দাদু কালপুরুষ,লুব্ধক, সপ্তর্ষিমণ্ডল,
বৃশ্চিকরাশি এসব আমাকে চিনিয়েছেন। আমাদের সেই মাটির ঘরটা ছিল একটু নীচু তে। উত্তরে বড়সড় কয়েকটা তালগাছ। আমাদের উঠোন থেকে পুরো আকাশ টা কে দেখা যায়না। আহা গাঢ় অন্ধকার রাতের আকাশ কি সুন্দর। একবার মাত্র ঐ দোতালা দালানে র উপরে উঠে ছাদ থেকে
সে আকাশ দেখেছিল। উত্তরের ধ্রুবতারা টাকে খুঁজে পেয়েছিল। কত নীচে পর্যন্ত আকাশের তারারা জোনাকির মতো আলো দিচ্ছে। এত তারা ! " আজি যত তারা তব আকাশে " দাদু এই গানটা শেখাতেন। ইস্কুলের ছেলেমেয়েদের
গাইতে হত। তাঁর সঙ্গে।
অনেক তারা তিনি আমাকে চিনিয়েছিলেন। কিন্তু -
আমার মনে হত গণক মামা কে বলি যে মামা, আমার মা মরে গিয়ে কোন তারা টা হয়ে গেছে গো। সেই তারা টাকে আমাকে চিনিয়ে দাও। আমাকে যে বলেছে তোমার মা ঐ আকাশে একটা তারা হয়ে গেছে। সেখান থেকে তোমাকে দেখছে।
কোন তারা টা, গণক মামা আমাকে চিনিয়ে দাও।
আমি বড় হয়ে তোমাকে অনেক টাকা দেব।
তোমাকে কষ্ট করে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরতে হবেনা।
তিনি এ বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় তার পিছু পিছু গেছি।
ভেবেছি বলি। কিন্তু বলা আর হয়নি।
No comments:
Post a Comment